শোবেইরি জানজানি: ইরানের ধর্মীয় পরিমণ্ডলের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০১ পিএম

ইরানের ধর্মীয় পরিমণ্ডলের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ মুসা শোবেইরি জানজানি ২০ সেপ্টেম্বর ৯৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এমন এক ব্যক্তিত্বের অবসান ঘটল, যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দূরত্ব বজায় রেখেও দেশটির গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের দুই প্রান্তেই প্রভাব ও সম্মান ধরে রেখেছিলেন।

ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোবেইরি জানজানির বিশেষ অবস্থানের অন্যতম কারণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। তিনি সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতিতে যুক্ত হননি। ফলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক পরিসরের বিভিন্ন মত ও গোষ্ঠীর রাজনীতিক এবং ধর্মীয় ব্যক্তিরা তাঁর কাছে যেতেন।

তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন ইরানের সাবেক সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি। কুমের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও তাঁর কাছে পড়াশোনা করেছেন। একই শিক্ষককের কাছে ইরানের রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিদের শিক্ষাগ্রহণ তাঁর প্রভাবের ব্যাপ্তি তুলে ধরে।

শোবেইরি জানজানি ছিলেন ইরানি ধর্মীয় নেতাদের এমন একটি ধারার অংশ, যারা মনে করতেন ধর্মীয় আলেমদের সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করা উচিত নয়। ১৯৯০-এর দশকে কুমের সেমিনারি স্কলারদের সোসাইটি যে সাতজন জ্যেষ্ঠ আলেমকে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ হিসেবে অনুসরণের যোগ্য এবং ‘মারজা’—অর্থাৎ ধর্মীয় কর্তৃত্ব হিসেবে স্বীকৃত—হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, তিনি ছিলেন তাঁদের একজন।

এই ধারার ধর্মীয় নেতাদের সাধারণত ‘ঐতিহ্যবাদী’ আলেম বলা হয়। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বজায় রাখা, মারজাইয়্যাহ বা শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে ভূমিকা রাখা—সরাসরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া নয়।

শোবেইরি জানজানি মনে করতেন, ধর্মীয় নেতাদের অতিরিক্ত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তাঁদের ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস দুর্বল করে দিতে পারে।

২০১৭ সালের এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ এবং মতপার্থক্যের কারণে আলেম ও মসজিদের মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বিষয়ে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।

শোবেইরি জানজানির ধর্মীয় জ্ঞান, বিশেষ করে ইসলামী আইনশাস্ত্র বা ফিকহে তাঁর দক্ষতার কারণে ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার মানুষ তাঁর পাঠে অংশ নিতেন।

১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে সংস্কারপন্থী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি তাঁর কাছে উচ্চতর ফিকহ পড়েন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাতামির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। খাতামির ভাই মোহাম্মদ রেজা খাতামি তাঁদের সম্পর্ককে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও আধ্যাত্মিক বন্ধন হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

অন্যদিকে, কুমের একটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ছেলেরাও শোবেইরি জানজানির ক্লাসে অংশ নিতেন। তাঁদের মধ্যে মোস্তফা ও মোজতবা খামেনির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলি খামেনি নিজেও শোবেইরির সঙ্গে তাঁর ছেলেদের ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে কথা বলেছিলেন। এতে বোঝা যায়, রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও শোবেইরির ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও শিক্ষাগত মর্যাদা ইরানের বিভিন্ন শিবিরে স্বীকৃত ছিল।

ইরানের ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেশটির রাজনীতিতে বড় মোড় তৈরি করে। সংস্কারপন্থী প্রার্থী মির হোসেইন মুসাভি ও মেহদি কাররুবি অভিযোগ করেছিলেন, নির্বাচনে কারচুপি করে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পক্ষে ফল দেওয়া হয়েছে। এরপর ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয় এবং সরকারি দমন-পীড়নে বহু মানুষ গ্রেপ্তার হন।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই শোবেইরি জানজানির দিকে তাকিয়েছিলেন। কারণ, সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৭০ জন রাজনৈতিক ও একাডেমিক ব্যক্তিত্ব—মুসাভি, কাররুবি ও খাতামিসহ—শিয়া ধর্মীয় নেতাদের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়ে আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আলেমদের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।

এরপর শোবেইরি জানজানি, গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ হোসেইন-আলি মন্তাজেরি এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি আয়াতুল্লাহ মোসাভি আরদাবিলি সমসাময়িক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

ধর্মীয় গবেষক মোহসেন কাদিভারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের সময় রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কমানোর চেষ্টা করতে শোবেইরি সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন। রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তারের পরও তিনি কয়েকবার তাঁদের মুক্তির জন্য হস্তক্ষেপ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১১ সালে মুসাভি ও কাররুবিকে গৃহবন্দি করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শোবেইরি তাঁদের মুক্তির জন্য খামেনিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে সংস্কারপন্থী শিবিরের একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে তাঁর সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

এর আগেও তিনি আলি খামেনির সঙ্গে দেখা করে খামেনির কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত ধর্মীয় নেতা মন্তাজেরির গৃহবন্দিত্ব প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে কাদিভার জানিয়েছেন।

রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার কারণে শোবেইরি জানজানি সবসময় ইরানের রক্ষণশীল অংশের সঙ্গে স্বস্তিদায়ক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেননি।

২০১৮ সালের শেষ দিকে সংস্কারপন্থী নেতা খাতামি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ নুরি এবং কয়েকজন সংস্কারপন্থী ব্যক্তির সঙ্গে শোবেইরির ছবি প্রকাশের পর রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ ইয়াজদি তাঁকে কঠোর ভাষায় চিঠি দেন।

চিঠিতে ইয়াজদি শোবেইরিকে তাঁর ধর্মীয় মর্যাদার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের সাক্ষাৎ এড়ানোর ব্যবস্থাও নিতে বলেন।

চিঠিটি ইরানের ধর্মীয় মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়। কয়েকজন আলেম শোবেইরির পক্ষ নেন। ধর্মীয় গবেষক মোহসেন কাদিভার ইয়াজদির চিঠির ভাষাকে হুমকিমূলক বলে সমালোচনা করেন।

তাঁর বক্তব্য ছিল, শোবেইরির ধর্মীয় কর্তৃত্ব কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সর্বোচ্চ নেতার কাছ থেকে পাওয়া নয়; বরং তাঁর মর্যাদা গড়ে উঠেছে ধর্মীয় জ্ঞান, গবেষণা ও ব্যক্তিগত ধর্মপরায়ণতার ভিত্তিতে।

ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে শোবেইরি জানজানির অবস্থান তাই কিছুটা ব্যতিক্রমী। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন না, আবার রাজনীতি থেকেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যবহার করে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

সংস্কারপন্থী থেকে রক্ষণশীল—ইরানের রাজনৈতিক পরিসরের ভিন্ন ভিন্ন অংশের মানুষ তাঁর ধর্মীয় জ্ঞান ও ব্যক্তিগত মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর ছাত্রদের তালিকায় মোহাম্মদ খাতামির মতো সংস্কারপন্থী নেতা এবং খামেনি পরিবারের সদস্যদের নাম থাকা সেই বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতারই ইঙ্গিত দেয়।

তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এমন একজন প্রবীণ আলেমের অধ্যায় শেষ হলো, যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশ না হয়েও রাজনৈতিক বিভাজনের দুই প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর উত্তরাধিকার তাই শুধু ধর্মীয় শিক্ষায় নয়, ইরানের জটিল ধর্মীয়-রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেও একটি স্বতন্ত্র অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত