মার্কিন প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর ইরানে নতুন বিতর্ক

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০২ পিএম

ইরানের হরমুজ প্রণালি সংকট নিরসনে সাত দফা প্রস্তাবের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো ‘ফিডব্যাক’ তেহরানে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়াটি কাতারের মাধ্যমে ইরানের কাছে পৌঁছেছে। এটিকে প্রস্তাবের সরাসরি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না বলে ‘ফিডব্যাক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর ইরানে মূল বিতর্ক এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার জন্য তেহরান কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকবে এবং কূটনৈতিক পথ ধরে রাখার বিনিময়ে কী মূল্য দিতে হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ইরানের সাত দফা প্রস্তাবকে অপর্যাপ্ত বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন। অন্যদিকে ইরানি কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় চলা পরোক্ষ আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সেখানে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

কট্টরপন্থীদের আপত্তি
ইরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী মহলের একটি অংশ মার্কিন প্রতিক্রিয়াকে কূটনীতির ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাম-ই জাম পত্রিকায় কট্টরপন্থী বিশ্লেষক আব্বাস সালিমি-নামিনের একটি মতামত প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ওয়াশিংটন সাত দফা কাঠামো মেনে নিতে অনিচ্ছুক, কারণ সেটিকে মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত পরাজয় স্বীকারের সমতুল্য হবে।

তার দাবি, মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এখনো ইরানকে বড় ধরনের ক্ষতি করার সম্ভাবনা ধরে রেখেছেন এবং ব্যর্থতা স্বীকারের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরানের প্রভাবশালী রক্ষণশীল দৈনিক কায়হান। পত্রিকাটির সম্পাদক হোসেইন শারিয়াতমাদারি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বিষয়ে যাচাইযোগ্য ছাড়ের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

কায়হানের যুক্তি হলো, হরমুজে অবাধ নৌ চলাচলের সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুকে যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অন্যতম প্রধান কৌশলগত চাপের হাতিয়ার দুর্বল করতে চাইছে। পত্রিকাটি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথিত অতিরিক্ত ‘ধৈর্যের’ সমালোচনা করে আরও কঠোর সামুদ্রিক পদক্ষেপের পক্ষে মত দিয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমা নিরাপত্তাবেষ্টিত জাহাজের বিরুদ্ধে চাপ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

আলোচনার পথ খোলা রাখার পক্ষে মধ্যপন্থীরা
তবে ইরানের মধ্যপন্থী মহলে পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। সংবাদপত্র শার্গ-এ বিশ্লেষক আহমাদ জেইদাবাদি যুক্তি দিয়েছেন, মার্কিন প্রতিক্রিয়া কঠোর হলেও ওয়াশিংটন কাতারের মাধ্যমে বিস্তারিত মতামত পাঠিয়েছে, এটি আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি, এমন একটি ইঙ্গিত। তিনি কাতারকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে আলোচনার চ্যানেলটি সচল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান সীমিত কিছু প্রযুক্তিগত নিশ্চয়তা দিতে পারে; এর মধ্যে সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পর্যবেক্ষণব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এর বিনিময়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে শিথিল করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

জেইদাবাদি সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, ইরানের বিমান চলাচল ও ব্যাংকিং খাতে চাপ বাড়ার সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে দেশটি আরও গভীর অর্থনৈতিক ও বেসামরিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়তে পারে। মার্কিন প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর ইরানের অভ্যন্তরীণ বিতর্কটি তাই আগের চেয়ে কিছুটা বদলে গেছে। প্রশ্নটি এখন শুধু কূটনীতি চালিয়ে যাওয়া হবে কি-না এমন নয়; বরং আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করতে হলে ইরান কতটা ছাড় দেবে এবং বিনিময়ে কী পাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

জাম-ই জাম, কায়হান ও শার্গের অবস্থান এ বিতর্কের তিনটি ভিন্ন দিক তুলে ধরছে। কায়হান কঠোর চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে; শার্গ কূটনৈতিক পথ ধরে রেখে সীমিত সমঝোতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা বলছে। আর জাম-ই জামের অবস্থান এই দুইয়ের মাঝামাঝি, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর সংশয় থাকলেও আলোচনার কাঠামোকে পুরোপুরি পরিত্যাগের কথা বলা হচ্ছে না।

ফলে ওয়াশিংটনের ‘ফিডব্যাক’ এখন তেহরানের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক বার্তা নয়। এটি ইরানের নীতিনির্ধারকদের সামনে হরমুজ, পারমাণবিক ইস্যু, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক চাপ- এই চারটি বিষয়কে একই আলোচনার কাঠামোয় কীভাবে সামলানো হবে, সেই কঠিন সিদ্ধান্তও সামনে এনেছে।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত