ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি খাতে বড় ধাক্কার ইঙ্গিত

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম

ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার ড্রোন হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ। সর্বশেষ মস্কো ও আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক ড্রোন হামলায় গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানি সংরক্ষণ ও বিতরণকেন্দ্র আক্রান্ত হওয়ার খবর এসেছে। একই সময়ে রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগারে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশটির জ্বালানি খাতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

৬ অক্টোবরের রাতের হামলাকে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো অঞ্চলে যুদ্ধ শুরুর পর অন্যতম বড় ড্রোন হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে রয়টার্স। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিনের দাবি, রাজধানীর দিকে ৬৫০টির বেশি ড্রোন পাঠানো হয়েছিল। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিওভ জানিয়েছেন, তার অঞ্চলে ১৮৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস বা ভূপাতিত করা হয়েছে। হামলায় দুজন নিহত ও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্রে হামলার অভিযোগ
হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল মস্কো অঞ্চলের ভোলোদারস্কায়া তেল সংরক্ষণ ও বিতরণকেন্দ্র; এমন দাবি করেছেন রুশ সামরিক ব্লগাররা। কেন্দ্রটিতে ডিজেল, পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি সংরক্ষণ করা হয়। এটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পাইপলাইন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতরণকেন্দ্র এবং মস্কোর প্রধান তেল শোধনাগারের সঙ্গে সংযুক্ত। রাজধানীর তিনটি বড় বিমানবন্দরেও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ করা হয় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

তবে কেন্দ্রটিতে সরাসরি হামলা ও ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের কিছু দাবির স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি। ইউক্রেনীয় একটি যুদ্ধবিষয়ক ব্লগে আগুনের ভিডিও প্রকাশ করা হলেও রয়টার্স জানিয়েছে, তারা ভিডিওটির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে হামলার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কিয়েভের দাবি অর্ধেকের বেশি শোধনক্ষমতা অচল
জ্বালানি খাতে ইউক্রেনের হামলার প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বড় দাবি এসেছে কিয়েভের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। তাদের হিসাবে মস্কো, ইয়ারোস্লাভল, উস্ত-লুগা, পার্ম, সারাতভ ও সিজরানের মতো এলাকায় তেল শোধনাগারে হামলার ফলে রাশিয়ার মোট তেল শোধনক্ষমতার ৫১ শতাংশ পর্যন্ত অচল হয়ে পড়েছে। তবে এই হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে নয়, ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দাবি হিসেবে দেখা উচিত।

তবে স্বাধীন কিছু তথ্যও রাশিয়ার জ্বালানি খাতে চাপের চিত্র তুলে ধরছে। রয়টার্সের সেপ্টেম্বরের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাশিয়ার ছয়টি প্রধান ডিজেল উৎপাদনকারী শোধনাগারের অর্ধেকই ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে অথবা পুরোপুরি বন্ধ করেছে।

ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে মস্কো
জ্বালানি সংকট সামাল দিতে রাশিয়া এরই মধ্যে ডিজেলসহ কিছু পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মস্কো সরাসরি জ্বালানি উৎপাদকদের ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর আগে রাশিয়া জানিয়েছিল, দেশে উৎপাদন অতিরিক্ত হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ডিজেল রপ্তানি বিধিনিষেধ আংশিক শিথিল করা হতে পারে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখাই এখন মস্কোর অন্যতম অগ্রাধিকার।

জ্বালানি অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলা চলতে থাকলে রাশিয়ার জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হতে পারে। কারণ দেশের শোধনাগারগুলো থেকে অপরিশোধিত তেলকে পেট্রল, ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত পণ্যে রূপান্তরের সক্ষমতা কমে গেলে শুধু অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নয়, রপ্তানি আয়ও প্রভাবিত হতে পারে।

মস্কো শোধনাগারেও বড় ক্ষতি
২০ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পর মস্কোর প্রধান তেল শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ বন্ধ হয়ে যায় বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছিল। হামলায় শোধনাগারের দুটি প্রধান অপরিশোধিত তেল পাতন ইউনিটে আগুন লাগে। মেরামত ও উৎপাদন পুনরুদ্ধারে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছিল। ওই শোধনাগার ২০২৪ সালে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ টন অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করেছিল। একই বছরে সেখানে প্রায় ২৯ লাখ টন পেট্রল ও ৩২ লাখ টন ডিজেল উৎপাদিত হয়েছিল। ফলে এর কার্যক্রমে বিঘ্ন রাশিয়ার রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানি সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব
রাশিয়ার জ্বালানি খাতে চাপের আরেকটি দিক হলো পেট্রল উৎপাদন কমে যাওয়া। রয়টার্সের জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার পেট্রল উৎপাদন মৌসুমি চাহিদার তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশের সমপর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। এর ফলে রাশিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি সরবরাহ, মূল্য এবং পরিবহন খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কৃষি, পণ্য পরিবহন ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় ডিজেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রলের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে ইউক্রেনীয় হামলা ও শোধনাগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি জানিয়েছেন, রাশিয়ার নতুন ধরনের বিমান হামলার জবাবে ইউক্রেন রুশ তেল শোধনাগারে হামলা আরও বাড়াতে পারে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়া ইউক্রেনের শহর ও বেসামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে হামলার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন গোয়েন্দা তথ্য কিয়েভ পেয়েছে। অর্থাৎ দুই দেশের যুদ্ধ এখন শুধু সম্মুখসমরের ক্ষেত্রেই নয়, জ্বালানি অবকাঠামোকেও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করছে। রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে, আর ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, সংরক্ষণকেন্দ্র ও বিতরণব্যবস্থাকে লক্ষ্য করছে।

সামনে কী হতে পারে?
রাশিয়ার জ্বালানি খাতে ইউক্রেনের হামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব এখন তিনটি ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে- শোধনক্ষমতা কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ। তবে কিয়েভের দাবি অনুযায়ী ৫১ শতাংশ শোধনক্ষমতা অচল হয়ে গেছে, এমন হিসাব এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। তাই এটিকে রাশিয়ার জ্বালানি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু ধারাবাহিক হামলার ফলে একাধিক বড় শোধনাগার একই সময়ে কম উৎপাদন করলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে পারে। তখন রাশিয়াকে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরও বেশি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প সরবরাহ এবং মজুত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইউক্রেনের কৌশলটি এখন রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক ভিত্তি ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় চাপ বাড়ানোর দিকে আরও স্পষ্টভাবে এগোচ্ছে। আর ৬ অক্টোবর মস্কো অঞ্চলের বিশাল ড্রোন হামলা দেখিয়ে দিয়েছে রাশিয়ার গভীর অভ্যন্তরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোও এই যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বাইরে নেই।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত