লন্ডন থেকে শুরু করে স্কটল্যান্ডের প্রত্যন্ত অঞ্চল-ব্রিটেনের এমন অনেক মানুষ, যারা কয়েক বছর আগেও নিজেদের রাজনৈতিক কর্মী বা আন্দোলনকর্মী হিসেবে ভাবতেন না, গাজা যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কেউ রাস্তায় নেমেছেন, কেউ সংসদ সদস্যদের চিঠি লিখেছেন, কেউ তহবিল সংগ্রহ করেছেন, আবার কেউ প্রতিবাদের কারণে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকিও নিয়েছেন।
আল জাজিরার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও নাগরিক সক্রিয়তায় গাজা যুদ্ধ বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। প্রতিবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি এখন শুধু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কর্মসূচি নয়; এটি শিল্পী, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, প্রশাসনিক কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
‘রাজনীতি করতাম না’, এখন প্রতিবাদে
স্কটল্যান্ডের এডিনবরার কাছাকাছি বসবাসকারী ৫২ বছর বয়সী ‘ক্লেয়ার’—ছদ্মনাম—তিন বছর আগেও নিজেকে রাজনৈতিক মানুষ মনে করতেন না। প্রশাসনিক কাজে যুক্ত এই নারী অবসর সময়ে বই পড়তেন ও পোষা কুকুরের সঙ্গে সময় কাটাতেন।
কিন্তু গাজা যুদ্ধের দৃশ্য ও ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ তাকে প্রতিবাদে যুক্ত করে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রথমে যুদ্ধবিরতির দাবিতে মিছিলে অংশ নেন। পরে সংসদ সদস্যদের চিঠি লেখা, ফিলিস্তিনিদের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শুরু করেন।
২০২৫ সালে তিনি ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদেও যুক্ত হন। এর ফলে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আন্দোলনের বিস্তার পেশা ও শ্রেণির সীমা ছাড়িয়েছে
ব্রিটেনে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক পরিধি। ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’, ‘আর্টিস্টস ফর ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘ওয়ার্কার্স ফর ফ্রি প্যালেস্টাইন’-এর মতো বিভিন্ন সংগঠন ও নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পী থেকে রেলকর্মী, আর্থিক খাতের কর্মী থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা—বিভিন্ন পেশার মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। অনেকেই ব্রিটিশ সরকারের ইসরায়েলনীতি, অস্ত্র সরবরাহ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ব্রিটেনে ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনের বিস্তার যে দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে, তার আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় ‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইন’ বা PSC-এর সদস্যসংখ্যায়। দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগঠনটির ব্যক্তিগত সদস্যসংখ্যা ২০২৩ সালের শুরুতে প্রায় ৭,৮০০ থেকে বেড়ে প্রায় ১৭,০০০ হয়েছে। তাদের নিউজলেটার গ্রাহকের সংখ্যাও প্রায় ৭০ হাজার থেকে বেড়ে ৩ লাখে পৌঁছেছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
রাজপথ থেকে ভোটের রাজনীতিতে
গাজা ইস্যু ব্রিটিশ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। PSC-এর incoming director Aimee Shalan-এর ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিন এখন ব্রিটেনে শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; এটি স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচনে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নেওয়া প্রার্থীরা কিছু এলাকায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। সংগঠনটির দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে তারা অংশীদার সংগঠনগুলোর সঙ্গে ৩৬টি জাতীয় বিক্ষোভ আয়োজন করেছে, যার কয়েকটিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছায়।
এ আন্দোলনের প্রভাব শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। PSC-এর বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের বিভিন্ন অংশ ফিলিস্তিনপন্থী বয়কট, ডিভেস্টমেন্ট ও নিষেধাজ্ঞার প্রচারণাকে সমর্থন করছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ৩৪টি কাউন্সিল তাদের পেনশন তহবিল থেকে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আন্দোলনকারীরা যেসব কোম্পানিকে চিহ্নিত করছে, সেগুলো থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও সংগঠনটি জানিয়েছে।
‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ ঘিরে আইনি সংঘাত
আন্দোলনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’কে ব্রিটিশ সরকারের নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা।
২০২৬ সালের জুনে ব্রিটেনের কোর্ট অব আপিল সংগঠনটির নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। এরপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’সহ বিভিন্ন পক্ষের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই লন্ডনে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ১৫২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়; তাদের মধ্যে ১৩৪ জনের বিরুদ্ধে Terrorism Act 2000-এর Section 12-এর অধীনে নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতি সমর্থন প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়।
এর আগে এপ্রিলেও প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে লন্ডনের একটি বিক্ষোভে ৫২৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ বলে রয়টার্স জানিয়েছিল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, গ্রেপ্তারকারীদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের অভিযোগ ছিল।
এখানেই ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের একটি বড় বিতর্ক সামনে এসেছে—জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগের সীমা কোথায় শেষ হবে এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিবাদের অধিকার কোথায় শুরু হবে।
আন্দোলনের পাশাপাশি পাল্টা উদ্বেগও বাড়ছে
ব্রিটেনে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ যত বিস্তৃত হয়েছে, একই সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। ৭ অক্টোবরের তৃতীয় বার্ষিকীতে ব্রিটিশ ইহুদি সংগঠনগুলো হামাসের ২০২৩ সালের হামলায় নিহতদের স্মরণে লন্ডনে সমাবেশ করেছে। সংগঠনগুলো ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত ও ২৫১ জনকে জিম্মি করার কথা স্মরণ করেছে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীরা গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর জন্য ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং ব্রিটিশ সরকারের নীতির সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে। ফলে ব্রিটিশ রাজপথে ফিলিস্তিন ইস্যু একই সঙ্গে মানবাধিকার, পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
গাজা কীভাবে ব্রিটিশ নাগরিকদের রাজনৈতিক করে তুলল
ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের বিস্তারকে শুধু বড় বড় মিছিল দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর একটি বড় অংশ এসেছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সরাসরি দৃশ্যমানতার মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজার ধ্বংসযজ্ঞ, নিহত শিশুদের ছবি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিডিও অনেক ব্রিটিশ নাগরিককে আগের তুলনায় বেশি সক্রিয় করেছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মনে করে, ব্রিটিশ সরকারের ঐতিহাসিক ও বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ফিলিস্তিন প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। অন্যদিকে সরকার ও সমালোচকেরা জাতীয় নিরাপত্তা, ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন।
ফলে গাজা যুদ্ধ ব্রিটেনের রাজনীতিতে এমন একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে, যার প্রভাব সংসদ, স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, ট্রেড ইউনিয়ন, কর্মক্ষেত্র এবং রাজপথ—সব জায়গাতেই দৃশ্যমান।
বদলে যাচ্ছে ব্রিটিশ রাজনৈতিক পরিসর
২০২৩ সালের আগে ব্রিটেনের অধিকাংশ সাধারণ নাগরিকের কাছে ফিলিস্তিন প্রশ্ন মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক একটি পররাষ্ট্রনীতি ইস্যু ছিল। কিন্তু তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধ, ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি এবং গাজার মানবিক বিপর্যয় এই ইস্যুকে ব্রিটিশ সমাজের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনার অংশ করে তুলেছে।
PSC-এর তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির সদস্য ও সমর্থক বেড়েছে; জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক বিক্ষোভ হয়েছে; শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় কাউন্সিলের মধ্যেও বিষয়টি প্রবেশ করেছে।
অন্যদিকে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’কে ঘিরে গ্রেপ্তার, নিষেধাজ্ঞা এবং আদালতের সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দিচ্ছে যে এই আন্দোলন এখন শুধু মানবিক সংহতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই—এটি ব্রিটেনে প্রতিবাদের অধিকার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার আইনি কাঠামো নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে।
অর্থাৎ গাজার যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে নয়, ব্রিটিশ সমাজের একটি অংশের রাজনৈতিক পরিচয় ও নাগরিক সক্রিয়তাকেও বদলে দিয়েছে। যারা একসময় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন, তাদের কেউ কেউ এখন মিছিলের সামনের সারিতে, কেউ কর্মক্ষেত্রে প্রচারণায়, কেউ স্থানীয় রাজনীতিতে এবং কেউ আদালত ও আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি। এই পরিবর্তন আগামী দিনগুলোতে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইরানকে ‘ম্যানিপুলেট’ করতে দেবেন না ট্রাম্প: হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা
ইরানে ফের বড় সামরিক অভিযান, প্রস্তুতির নির্দেশ পেন্টাগনের
হুথিদের হামলার নিন্দা, সৌদির পাশে সিরিয়া
দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আজ
দুর্যোগ মোকাবিলায় জবির শিক্ষার্থীদের রেড ক্রিসেন্টের প্রশিক্ষণ
১৭ হাজার ফুট উঁচুতে বজ্রপাতের কবলে যাত্রীবাহী বিমান
জুতো নেই, শাড়ি পরে দৌড়ালেন ১৬০০ মিটার!