ইউক্রেনে রাশিয়ার তীব্র হামলা, শিশুসহ নিহত ২৮

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ এএম

ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচটি শিশু রয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোরে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকি শহরের একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে হতাহতের এই ঘটনা ঘটে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, প্রিলুকির হামলায় নিহত পাঁচ শিশুর মধ্যে তিনজনের বয়স ছিল মাত্র এক বছর। আরেক শিশুর বয়স ছিল আট বছর। সন্ধ্যায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, শুধু প্রিলুকির ওই হামলাতেই ২০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে, যাদের মধ্যে অন্তত সাতজন শিশু রয়েছে।

ঘুমন্ত মানুষের ওপর আঘাত

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে হামলাটি হয়। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পাঁচতলা ভবনটির বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় আশপাশের ভবনের জানালাও ভেঙে যায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে কংক্রিট ও ধাতব কাঠামোর টুকরো।

৪০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা ও ম্যাসাজ থেরাপিস্ট ওলেনা সায়ুন এএফপিকে বলেন, হামলার সময় তারা বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন। বিস্ফোরণে ঘরের জানালা উড়ে যায়। নিজের ও স্বামীর শরীর দিয়ে তারা সন্তানকে ঢেকে রাখেন।

তিনি জানান, তার স্বামী ও তিনি দুজনেই সামান্য আহত হয়েছেন। হামলার পর শিশুটি প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পরে তারা বাথরুমে আশ্রয় নেন।

জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, সাধারণ শহর ও সাধারণ মানুষের জীবনকে লক্ষ্য করেই রাশিয়া হামলা চালাচ্ছে।

তার ভাষায়, ইউক্রেনের মানুষ ও শিশুদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ‘সন্ত্রাসের একটি সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত পছন্দ’।

বিভিন্ন শহরে হতাহত

প্রিলুকি ছাড়াও ইউক্রেনের আরও কয়েকটি এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ইউক্রেনের ক্রেমেনচুকে একটি বহুতল ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে দুজন নিহত হন। ওলেক্সান্দ্রিয়াতেও আরও দুজন নিহত হয়েছেন।

রাজধানী কিয়েভের ঘনবসতিপূর্ণ দারনিতস্কি এলাকায় হামলার পর সৃষ্ট আগুনে দুজন নিহত হন বলে মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানিয়েছেন। পরে রাজধানীতে আরও দুটি প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাতভর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩০টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল দনিপ্রোপেত্রোভস্ক, কিয়েভ, খারকিভ ও পোলতাভা অঞ্চল।

ইউক্রেনের দাবি, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ৩৯টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং শতাধিক ড্রোন প্রতিহত করেছে। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জেলেনস্কি।

শীতের আগে জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ

ইউক্রেনে শীত মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রুশ হামলা আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেলেনস্কি এক দিন আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং জ্বালানি অবকাঠামো বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

কিয়েভেও সাম্প্রতিক সময়ে হামলা বেড়েছে। বারবার বিমান হামলার সাইরেন বাজায় নগরীর বাসিন্দাদের অনেকে রাত কাটাচ্ছেন মেট্রো স্টেশনে। কেউ সঙ্গে নিচ্ছেন প্রয়োজনীয় কাপড় ও ব্যাগ, কেউবা সঙ্গে রাখছেন কম্বল ও ঘুমানোর সামগ্রী।

কিয়েভের মেয়র ক্লিৎসকো জানিয়েছেন, বুধবারের হামলার পর রাজধানীর কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শহরের ডান তীরের কিছু এলাকায় পানি সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়।

ব্যাংকে কর্মরত কিয়েভের বাসিন্দা ইরিনা রিবালচেঙ্কো এএফপিকে বলেন, হামলার আশঙ্কায় তারা মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নিয়েছেন। তার ভাষায়, পুরো কিয়েভেই এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রুশ নিয়ন্ত্রিত এলাকাতেও প্রাণহানি

এদিকে ইউক্রেনের পাল্টা হামলাতেও রুশ নিয়ন্ত্রিত ও রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় অঞ্চলে বেসামরিক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

রুশ-সমর্থিত কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত খেরসন অঞ্চলে ড্রোন হামলায় এক কিশোরীসহ দুজন নিহত হয়েছেন। রাশিয়া-সমর্থিত দোনেৎস্কের স্থানীয় কর্মকর্তারাও একটি গ্রামের ওপর ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হওয়ার দাবি করেছেন।
তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

জেলেনস্কি বলেছেন, রুশ হামলার জবাবে ইউক্রেনও দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছে। তার দাবি, ইউক্রেনের হামলায় পার্ম, সামারা ও আস্ট্রাখান অঞ্চলের দুটি তেল স্থাপনা এবং একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রসহ কৃষ্ণসাগর এলাকায় রুশ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

বেসামরিক প্রাণহানি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সাম্প্রতিক পর্যায়ে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুম সামনে রেখে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও তীব্র হতে পারে।

ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও দ্রুতগতির নতুন ধরনের ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা কঠিন হয়ে উঠছে বলে কিয়েভের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জেলেনস্কি নতুন ও শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।

অন্যদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষই একে অপরের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও ক্রমেই বাড়ছে।

এমইউ
আরও পড়ুন