ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এখন আর শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের অংশ নয়; বরং তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসরত লাখো বিদেশি নাগরিক, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। এমন মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নরম্যান রুলে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি সংবাদমাধ্যম আরব নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রুলের মতে, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর, প্রশিক্ষিত ও আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত। বছরের পর বছর হুথিদের ছোড়া অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। তবে কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই সব হামলা ঠেকাতে পারে না। ফলে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, যা প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হয়। তিনি বলেন, বেসামরিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে চাপ, সৌদিতে পাল্টা হামলা
রুলের ধারণা, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর কাছে কিছু এলাকা হারানোর পর হুথিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা বাড়াতে পারে। সৌদি সমর্থন বন্ধে রিয়াদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই এ ধরনের হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। রুলের ভাষ্য, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে অগ্রগতি অর্জন করায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করে প্রতিশোধ নেওয়ার কৌশল নিতে পারে। তবে এটি তার বিশ্লেষণ; হুথিদের হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য হিসেবে একে দেখা যায় না।
হুতিরা নিজেদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ইসরায়েলবিরোধী লড়াই বলে দাবি করলেও রুল এ বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, হুথিদের হামলায় সৌদি আরবসহ বিভিন্ন স্থানে বহু মুসলিম নিহত হয়েছেন। তার মতে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহন স্থাপনায় হামলা চালানোর নজির রয়েছে গোষ্ঠীটির। তিনি বলেন, কোনো ভবনে গাড়িবোমা হামলা হলে সেটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলা হয়। কিন্তু কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ব্যবহার করে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক দুর্বল হয়ে পড়ে। রুলের মতে, এই দ্বৈত মানদণ্ডের অবসান হওয়া প্রয়োজন।
লোহিত সাগর ও পূর্ব আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা
রুলের আশঙ্কা, হুথিদের হুমকি সৌদি আরবের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে। ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি লোহিত সাগর ও পূর্ব আফ্রিকায় নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা রয়েছে গোষ্ঠীটির। তিনি সোমালিয়ার সশস্ত্র সংগঠন আল-শাবাবের সঙ্গে হুতিদের সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, ইরান ও হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব আফ্রিকাকে ইয়েমেনে প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পাঠানোর ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে আল-শাবাবের সঙ্গে সহযোগিতার মাত্রা এবং এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ড্রোন হামলার সক্ষমতা কতটা বাড়তে পারে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রুলের মতে, হুথিরা সরাসরি বাব আল-মান্দেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পথে না-ও যেতে পারে। কারণ, লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ রাশিয়া ও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত। এসব দেশের জাহাজকে তুলনামূলকভাবে এড়িয়ে চলার প্রবণতা থাকলে সম্পূর্ণ নৌপথ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত তাদের স্বার্থের বিরোধী হতে পারে। বরং সৌদি আরব, পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েলের স্বার্থে চাপ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে অনিশ্চয়তা বজায় রাখার কৌশল হুথিরা অনুসরণ করতে পারে বলে ধারণা করেন সাবেক এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
ইরানের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা
রুলের দাবি, হুথিরা এখন স্থানীয়ভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো ও কিছু মৌলিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হলেও উন্নত প্রযুক্তির জন্য ইরানের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ছোট নৌযানের মাধ্যমে অস্ত্র ও প্রযুক্তি ইয়েমেনে পৌঁছানোর অভিযোগও করেন তিনি। তার মতে, মাছ ধরার নৌকা ও চোরাচালানে ব্যবহৃত ছোট জলযানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এসব চালান শনাক্ত ও আটক করা কঠিন। তবে হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে শুধু সরাসরি নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন রুল। তার ভাষ্য, ইরান হুতিদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক হলেও গোষ্ঠীটির নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে। ফলে হুথিদের প্রতিটি পদক্ষেপ সরাসরি তেহরানের নির্দেশে পরিচালিত হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
তিনি আরও বলেন, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের কর্মকর্তারা মিত্র বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ইয়েমেনেও ইরানি কর্মকর্তাদের আরও প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এ বক্তব্যকে নিশ্চিত তথ্য নয়, বরং তার মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান
হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রুলে। তার মতে, সৌদি আরবের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণে প্রথমে দেশটির সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তিনি বলেন, কূটনৈতিক সমাধান কাম্য হলেও কেবল নিন্দা জানিয়ে আলোচনা শেষ করা যথেষ্ট নয়। হুথিরা যদি সমঝোতায় রাজি না হয় এবং নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে হামলা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী করবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।
রুলের দাবি, সাম্প্রতিক সংকট যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইয়েমেনের সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্র-হুথি বা সৌদি-হুথি যুদ্ধে পরিণত করা উচিত নয়। তার মতে, ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল দায়িত্ব ইয়েমেনিদেরই। হুথিরা যেন সংঘাতকে বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামুদ্রিক হামলার প্রভাব যেহেতু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তাই সমস্যাটির সমাধানেও সমন্বিত উদ্যোগ দরকার বলে মনে করেন তিনি। রুলের ভাষায়, হুথিদের হামলা এখন আর কেবল ইয়েমেন বা সৌদি আরবের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক হুমকি, যার মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সৌদি আরামকোর দাহরান কমপ্লেক্সে হামলা
ইরানে অপহরণকারী দলের পাঁচ সদস্য নিহত, প্রকৌশলী উদ্ধার
সৌদির রিয়াদ দাম্মামসহ বিভিন্ন শহরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
মার্কিন নৌবাহিনীতে বড় পরিবর্তনের নেপথ্যে রহস্যময় এক নাবিক, খুঁজে পাচ্ছে না পেন্টাগনও
হরমুজের বাইরে পর্যন্ত জাহাজে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান