গাজায় হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও চলছে জলপাই সংগ্রহ

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৯ এএম

যুদ্ধের ক্ষত, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাগান আর জমিতে প্রবেশের বিধিনিষেধ সব বাধা পেরিয়ে গাজায় জলপাই সংগ্রহ করছেন ফিলিস্তিনি কৃষকেরা। একসময় যে জলপাইবাগান ছিল বহু পরিবারের জীবিকা ও খাদ্যের প্রধান উৎস, যুদ্ধের ধাক্কায় তার বড় অংশই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবু অবশিষ্ট গাছগুলো থেকে ফল সংগ্রহ করে জীবিকা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার জলপাই উৎপাদন খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষিজমি ধ্বংস, সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এবং উৎপাদনব্যবস্থার বিপর্যয়ে এবার জলপাইয়ের ফলন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

Gaza-1

দুই মিলিয়ন গাছের মধ্যে টিকে আছে দেড় লাখ
গাজার কৃষি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে উপত্যকাটিতে প্রায় ২০ লাখ জলপাইগাছ ছিল। এখন টিকে আছে আনুমানিক দেড় লাখ। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রায় ৪০ হাজার টন জলপাই উৎপাদিত হতো, এবার তা কমে প্রায় ৫ হাজার টনে নেমে আসতে পারে। জলপাই থেকে উৎপাদিত তেলের পরিমাণও ব্যাপকভাবে কমার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধের আগে বছরে প্রায় ৫ হাজার টন জলপাই তেল উৎপাদিত হলেও এবার তা নেমে আসতে পারে মাত্র ৭০০ টনে।

মধ্য গাজার এক কৃষক হায়দার আবু মিদাইন রয়টার্সকে জানান, তার পরিবারের প্রায় ৯০০ দুনুম বা ২২০ একর জমির জলপাইবাগানের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। বাগানের প্রায় অর্ধেক এখন ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর ওপারে। বাকি অংশেরও অধিকাংশ গাছ বুলডোজার দিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে তিনি জানান। একসময় ওই বাগান থেকে বছরে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টন জলপাই পাওয়া যেত। এখন সেখানে টিকে আছে মাত্র ২০ থেকে ৩০টি গাছ। সেগুলো থেকে এবার যে তেল পাওয়া যাবে, তা দিয়ে পরিবারের প্রয়োজনও পুরোপুরি মিটবে না বলে জানান তিনি।

বাজারে তেলের সংকট, বেড়েছে দাম
জলপাই শুধু গাজার একটি কৃষিপণ্য নয়; এটি স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস, অর্থনীতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফল বিক্রি এবং তেল উৎপাদনের মাধ্যমে বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। যুদ্ধের কারণে সেই অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় আগে প্রায় ৪০টি জলপাই তেল নিষ্কাশনকেন্দ্র চালু ছিল। বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র সাতটি, সেগুলোও সীমিত সক্ষমতায় কাজ করছে।

উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে জলপাই তেলের দামও বেড়েছে। প্রতিবেদনে স্থানীয় বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ লিটারের একটি ড্রামের দাম প্রায় ৫০০ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধের আগের দামের প্রায় তিন গুণ। ফলে অনেক পরিবারের জন্য এই তেল কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একদিনের কাজই এখন বড় প্রাপ্তি
দেইর আল-বালাহর কিছু এলাকায় এখনো জলপাই সংগ্রহ চলছে। পরিবারের সদস্যরা গাছ থেকে ফল পাড়ছেন, সেগুলো থেকে পাতা ও ডাল আলাদা করছেন। কেউ কেউ অল্প মজুরিতে কাজ করে দিনের খাবারের সংস্থান করছেন। রয়টার্সকে এক শ্রমিক জানান, আগে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে দুই থেকে তিন মাস কাজ পাওয়া যেত। এখন একদিনের কাজ পাওয়াও তার কাছে বড় প্রাপ্তি। কারণ, পরিবার ও সন্তানদের জন্য খাবার জোগাড় করাই এখন প্রধান চিন্তা।

গাজায় জলপাই সংগ্রহের এই দৃশ্য তাই কেবল কৃষিকাজের মৌসুমি চিত্র নয়। এর মধ্যে রয়েছে ধ্বংসের পরও টিকে থাকার চেষ্টা, খাদ্যসংকটের সঙ্গে লড়াই এবং হারিয়ে যেতে বসা জীবিকার পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা। যুদ্ধের কারণে গাজার কৃষি খাত কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে জলপাইগাছ। যেসব গাছ একসময় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে খাদ্য ও আয় জুগিয়েছে, সেগুলোর অনেকই এখন আর নেই। অবশিষ্ট গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো অন্তত নিজেদের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাইছে।
সূত্র: রয়টার্স ও আনাদোলু এজেন্সি

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত