ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে কোনো আঞ্চলিক দেশ অংশ নিলে বা নিজেদের ভূখণ্ড, আকাশসীমা ও সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দিলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা অবিভাজ্য; এক দেশের নিরাপত্তা বিপন্ন করে অন্য কোনো দেশ নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারবে না।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে সামরিক চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টার সমালোচনা করে বলা হয়, অতীতের সংঘাতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো সম্ভব হলেও প্রতিপক্ষের ওপর রাজনৈতিক ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া সব সময় সম্ভব নয়।
নিবন্ধে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদারের হুমকি এমন এক সময়ে সামনে আসছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। তবে সামরিক হুমকির পেছনে শুধু নির্বাচনী বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব কাজ করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
মেহের নিউজের নিবন্ধে বলা হয়, ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রশ্নটি কেবল তেহরান, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকেও নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।
ইরানের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড বা সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। তেহরানের মতে, এসব সুযোগ যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনায় সহায়তা করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আর সংঘাতের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক থাকবে না; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণের অংশ হয়ে উঠবে।
তবে কোনো দেশে বিদেশি সেনাঘাঁটি থাকা মানেই সেই দেশ সংশ্লিষ্ট সব সামরিক অভিযানে অংশ নিচ্ছে—এমন নয়। নিবন্ধেও প্রচলিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সহায়তার মধ্যে পার্থক্য করার কথা বলা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি বাগদাদে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে নিবন্ধে বলা হয়, ‘হয় আমরা একসঙ্গে নিরাপত্তা গড়ে তুলব, নয়তো একসঙ্গে অনিরাপত্তার মধ্যে পড়ব।’
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, পারস্য উপসাগর ও পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিনিয়োগের দিক থেকে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিস্তৃত সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জাহাজ চলাচল, জ্বালানি বাজার, পরিবহনব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো দেশের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা অবকাঠামো যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিণতিও সংশ্লিষ্ট দেশকে বিবেচনায় নিতে হবে।
নিবন্ধে ইরানের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ির আগের বক্তব্যের উল্লেখ করে বলা হয়, আঞ্চলিক বিভেদ ও সংঘাত বিস্তারের উদ্যোগে অংশ নেওয়া আরব ও মুসলিম দেশগুলোর জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এতে আরও বলা হয়, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামরিক আগ্রাসনে সহায়তাকারী হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার বিষয়টি ইরানের নিরাপত্তা বিবেচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সামরিক অভিযানে সহায়তা শুধু অস্ত্র, সেনাঘাঁটি বা যুদ্ধবিমান সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাও সংঘাতের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিবন্ধে বলা হয়, ইরানের কাছে বর্তমান পরিস্থিতি কেবল সাময়িক বিরোধ বা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নয়। তেহরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু বক্তব্য দেশটির অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরি করছে। এ কারণে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নটি ইরানের নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের উদ্দেশে দেওয়া সাম্প্রতিক বার্তারও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জিহাদ, প্রতিরোধ ও দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
তবে নিবন্ধে ইরানের অবস্থান তুলে ধরা হলেও আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা হিসাব এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নিজস্ব নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব বিবেচনায় বিভিন্ন দেশের নীতি ভিন্ন হতে পারে।
সংঘাত এড়ানোই কি আঞ্চলিক দেশগুলোর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ?
মেহের নিউজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সামনে এখন দুটি পথ—সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে উত্তেজনা বাড়ানো, অথবা কূটনৈতিক উদ্যোগ ও যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করা।
ইরানের বার্তা হলো, প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বরং এমন সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ঝুঁকি এবং বহিরাগত শক্তির ওপর নিরাপত্তাগত নির্ভরতা বাড়াতে পারে।
নিবন্ধের শেষাংশে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই একটি দেশের বিরুদ্ধে সংঘাত উসকে দিয়ে অন্য দেশ নিজেকে তার পরিণতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে পারবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জাপানের বাণিজ্য ঘাটতি ২.৮১ ট্রিলিয়ন ইয়েন
ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ লাখের বেশি ভিসা বাতিল
‘চরমপন্থি ইসলামের আগ্রাসনের’ শিকার ফ্রান্স: নেতানিয়াহু
নাটোরে বাস-ট্রাকের সংঘর্ষে ১২ প্রাণহানির ঘটনায় চালকদের বিরুদ্ধে মামলা
ইরাকি কুর্দিস্তানে মাইক্রো-ড্রোন মোতায়েন
দুই হাজার বছর আগের এক ব্যক্তির মুখাবয়ব উন্মোচন