'গুপ্তচরবৃত্তি' ইরানের জন্য বড় ধরণের হুমকি

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দুই দফা যুদ্ধে ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে গুপ্তচরবৃত্তির হুমকিকে কাজে লাগিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, ইরানের সামনে প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি সেই ঝুঁকির অজুহাতে রাজনৈতিক বিরোধিতা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি অ্যাট চ্যাটানুগার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ গোলকার বলেন, ইরানের সামনে গুপ্তচরবৃত্তির বাস্তব হুমকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, যিনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোলকারের মতে, ইরানের শাসকগোষ্ঠী অতীতেও প্রকৃত কিংবা কথিত নিরাপত্তাহুমকিকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করেছে। এসব হুমকির ভিত্তিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো আরও বিস্তৃত করা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিশ্লেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান অভিযানেও দুটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে—একদিকে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা মোকাবিলার প্রয়োজন, অন্যদিকে ভিন্নমত দমন ও সমাজে ভয় সৃষ্টি করার বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য।

তবে সরকারের প্রতিটি নিরাপত্তা অভিযানকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন হিসেবে দেখাও যথাযথ হবে না। বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও নাশকতার বাস্তব ঝুঁকি থাকলে রাষ্ট্রের পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন হতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, এসব পদক্ষেপ কতটা নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না।

শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ঘটনা ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিপক্ষ কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবস্থান, চলাচল কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে—তা নিয়ে গোয়েন্দা মহলে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার কথা।

এ ধরনের ঘটনায় শুধু গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা নয়, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ শনাক্ত করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট হামলার পেছনে কারা কীভাবে তথ্য সরবরাহ করেছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগুলো সাধারণত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। কিন্তু নিরাপত্তার নামে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা কিংবা সরকারের সমালোচকদের গুপ্তচর হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠলে তা নাগরিক অধিকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইরানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিদেশি শক্তির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করা হচ্ছে, বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিরোধিতাকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা করা হচ্ছে কি না।

কারণ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপত্তার অজুহাতে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি থেকে রক্ষা করাও জরুরি।

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি একটি বৃহত্তর দ্বন্দ্ব সামনে এনেছে—যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র কতটা কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে পারে এবং সেই ক্ষমতার সীমা কোথায় হওয়া উচিত।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে একদিকে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও সম্ভাব্য নাশকতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা বজায় রাখতে হলে স্বচ্ছ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী হওয়া অনিবার্য নয়। কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন শক্তিশালী হয়, তেমনি নাগরিকদের আস্থাও বজায় থাকে।

সূত্র: আলজাজিরা

এমইউ
আরও পড়ুন