স্পেনের দুই ট্রেনের সংঘর্ষ 

ট্রেন দুটি কী ধরনের প্রযুক্তিতে চলত?

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০০ পিএম

দ্রুতগতির ট্রেন, কম্পিউটারনিয়ন্ত্রিত সংকেতব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় গতি পর্যবেক্ষণ, আধুনিক রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তিতে ত্রুটি দেখা দিলে এবং বিকল্প ব্যবস্থায় ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়ার সময় সমন্বয় বা সিদ্ধান্তে ভুল হলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, স্পেনের দুটি উচ্চগতির ট্রেনের সংঘর্ষ সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

স্পেনের মাদ্রিদ-সেভিয়া উচ্চগতির রেলপথে রেনফে (Renfe) পরিচালিত একটি এভিই (AVE) ট্রেনের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থা ইরিওর (Iryo) একটি ট্রেনের সংঘর্ষের পর তদন্তের কেন্দ্রে এসেছে রেলপথের নিরাপত্তা প্রযুক্তি LZB। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কম্পিউটারজনিত ত্রুটির কারণে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার রেলপথে এই ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এরপর কয়েকটি ট্রেন থেমে যায় এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে চলাচল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়।

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাব্যবস্থা বিকল হওয়ার পর রেনফের ট্রেনটিকে স্বাভাবিক গতিতে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও সামনে ইরিওর ট্রেনটি তখনও থেমে ছিল। পরে দুটি ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। তবে ঠিক কোন সিদ্ধান্ত, সংকেত বা যোগাযোগের ত্রুটিতে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন দুটি কী ধরনের?

দুর্ঘটনায় জড়িত ট্রেন দুটি একই ধরনের হলেও এক মডেলের নয়। সংবাদমাধ্যমের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রেনফের ট্রেনটি ছিল জার্মান নির্মাতা সিমেন্সের তৈরি ভেলারো (Velaro) সিরিজের এভিই ট্রেন, আর ইরিওর ট্রেনটি ছিল ইতালির ফ্রেচ্চিয়ারোসা ১০০০ পরিবারের ETR1000 মডেল।

রেনফে এভিই—ভেলারো প্রযুক্তি: স্পেনের উচ্চগতির রেল পরিষেবার পরিচিত নাম এভিই। ভেলারো সিরিজের ট্রেনগুলো বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলে এবং উচ্চগতিতে যাত্রী পরিবহনের জন্য তৈরি। এ ধরনের ট্রেনে বৈদ্যুতিক চালনা, কম্পিউটারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, চালকের কক্ষে সংকেত প্রদর্শন এবং রেলপথের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রযুক্তি থাকে।

ইরিও-ফ্রেচ্চিয়ারোসা ১০০০: ইরিওর বহরে ব্যবহৃত ETR1000 একটি আধুনিক বৈদ্যুতিক উচ্চগতির যাত্রীবাহী ট্রেন। এর নকশা উচ্চগতির চলাচল, যাত্রী আরাম এবং শক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বিবেচনায় তৈরি। তবে ট্রেনের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেই সংঘর্ষের ঝুঁকি দূর হয় না; রেলপথের সংকেত, চলাচলের অনুমতি এবং ট্রেনগুলোর মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: ট্রেনের চালনা প্রযুক্তি আর রেলপথের সংকেত ও নিরাপত্তা প্রযুক্তি এক নয়। ট্রেন কীভাবে চলে, তা নির্ধারণ করে তার ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক মোটর ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। আর কখন চলবে, কত গতিতে চলবে এবং সামনে অন্য ট্রেন থাকলে কীভাবে থামবে—এসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে সংকেত ও ট্রেন-সুরক্ষা ব্যবস্থা।

LZB কী এবং কীভাবে কাজ করে?

LZB হলো জার্মান শব্দ Linienzugbeeinflussung-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি এমন একটি রেল-নিরাপত্তাব্যবস্থা, যা ট্রেনের গতি ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং চালকের কক্ষে প্রয়োজনীয় চলাচল-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠায়।

স্পেনের মাদ্রিদ-সেভিয়া উচ্চগতির রেলপথে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নির্ধারিত গতিসীমা বজায় রাখা এবং ট্রেনের চলাচল নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখা।

LZB ব্যবস্থার কাজ কয়েকটি ধাপে বোঝা যায়:

১. তথ্য বিনিময়: রেলপথে স্থাপিত যন্ত্রপাতি এবং ট্রেনে থাকা সরঞ্জামের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান হয়।

২. গতি পর্যবেক্ষণ: ট্রেনের বর্তমান গতি ও অনুমোদিত গতিসীমা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

৩. চালককে নির্দেশনা: সামনে কত দূর পর্যন্ত চলাচলের অনুমতি রয়েছে এবং কখন গতি কমাতে হবে, সে বিষয়ে চালকের কক্ষে তথ্য দেখানো হয়।

৪. স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা: নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে বা প্রয়োজনীয় ব্রেকিং না হলে ব্যবস্থাটি পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক প্রয়োগ করতে পারে।

এই প্রযুক্তির সুবিধা হলো, শুধু চালকের দৃষ্টিশক্তি ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে ট্রেনের গতি এবং চলাচলকে একটি স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাকাঠামোর মধ্যে রাখা যায়। তবে LZB অকার্যকর হয়ে গেলে বিকল্প সংকেতব্যবস্থা ও পরিচালনবিধি সঠিকভাবে অনুসরণ করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

৬৩ কিলোমিটার পথে কী ঘটেছিল?

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের দেওয়া প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কম্পিউটারজনিত ত্রুটিতে রেলপথের প্রায় ৬৩ কিলোমিটার অংশে LZB ব্যবস্থা বিকল হয়। এতে কয়েকটি ট্রেন থেমে যায় এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষকে বিকল্প পদ্ধতিতে চলাচল পরিচালনা করতে হয়।

প্রাথমিক সময়রেখা অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৩৬ মিনিটের দিকে রেনফের এভিই ট্রেনটিকে আবার চলার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রায় ২৫ কিলোমিটার এগোনোর পর সকাল ৮টা ৫৩ মিনিটের দিকে ট্রেনটি সামনে থেমে থাকা ইরিওর ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় বলে কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিবরণে বলা হয়েছে।

তবে এই সময়রেখার প্রতিটি বিবরণ এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও দুই ট্রেনের মধ্যে যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট ক্রম তদন্তসাপেক্ষ। ইরিওর ট্রেন কেন থেমে ছিল, সেটিকে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

এলেজেডবি বিকল হলে কি ট্রেন চালানো যায়?

নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি অংশ বিকল হলেই সব ক্ষেত্রে রেল চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে—এমন নয়। তবে চলাচল চালু রাখার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা, সংকেতের অবস্থা, রেলপথের দখল এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালনবিধির ওপর।

এলেজেডবি কাজ না করলে বিকল্প পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচল পরিচালনা করা যেতে পারে। স্পেনের এই রেলপথে বিকল্প হিসেবে পার্শ্ববর্তী সংকেতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা প্রতিবেদনে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে চালককে লাইনের সংকেত ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের নির্দেশ মেনে চলতে হয়। কোনো সংকেত থামার নির্দেশ দিলে সেটি অমান্য করে স্বাভাবিক গতিতে চলা যাবে না; ব্যতিক্রমী চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট বিধি ও অনুমোদন প্রয়োজন।

এ কারণেই এলেজেডবি বিকল হওয়াকে দুর্ঘটনার একমাত্র কারণ বলা যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তাব্যবস্থা বিকল হওয়ার পর কীভাবে চলাচল পরিচালিত হয়েছে, নিয়ন্ত্রণকক্ষ কী নির্দেশ দিয়েছে এবং ট্রেনের অবস্থান সম্পর্কে কী তথ্য ছিল—সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করা জরুরি।

প্রযুক্তি থাকলেই কি দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব?

আধুনিক রেলব্যবস্থায় প্রযুক্তি দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমায়, কিন্তু নিরাপত্তার জন্য একাধিক স্তরের ব্যবস্থা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে সংকেতপ্রযুক্তি, ট্রেনের অবস্থান শনাক্তকরণ, স্বয়ংক্রিয় ব্রেক, নিয়ন্ত্রণকক্ষের যোগাযোগ, চালকের প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অনুসরণীয় স্পষ্ট বিধি।

একটি ব্যবস্থা বিকল হলে অন্য ব্যবস্থা কীভাবে দায়িত্ব নেবে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকা দরকার। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মী ও ট্রেনচালকদের কাছে একই সময়ের সঠিক তথ্য পৌঁছানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেনের দুর্ঘটনার তদন্তে তাই শুধু কম্পিউটার ত্রুটি নয়, বরং ত্রুটির পর গৃহীত সিদ্ধান্ত, সংকেতের অবস্থা, বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং যোগাযোগের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করতে হবে। কোনো একটি যন্ত্র বা ব্যক্তিকে আগেভাগে দায়ী করার পরিবর্তে পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যক্রম বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।

এলেজেডবি থেকে ইআরটিএমএস: প্রযুক্তির পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইউরোপের রেলব্যবস্থায় বিভিন্ন দেশের সংকেতপ্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে এবং আন্তসীমান্ত রেল চলাচল সহজ করতে ইউরোপীয় রেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ERTMS) চালু করা হয়েছে। এর ইউরোপীয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ অংশ ETCS ট্রেনের গতি ও চলাচলের অনুমোদন পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় ব্রেকিংয়ের মতো নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করে।

স্পেনের মাদ্রিদ-সেভিয়া উচ্চগতির রেলপথে ব্যবহৃত LZB প্রযুক্তিকে ধাপে ধাপে আরও আধুনিক ব্যবস্থায় প্রতিস্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে নতুন প্রযুক্তি স্থাপন করলেই নিরাপত্তার সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নতুন ও পুরোনো ব্যবস্থার সামঞ্জস্য, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যারের নির্ভরযোগ্যতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কর্মীদের প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেনের রেল দুর্ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি দেখা দিলে পুরো রেল পরিচালনা কাঠামো কতটা প্রস্তুত থাকে?

LZB-এর মতো প্রযুক্তি ট্রেনের গতি পর্যবেক্ষণ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রযুক্তিগত ত্রুটির পর বিকল্প পদ্ধতি সঠিকভাবে কার্যকর না হলে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই নিরাপদ রেল চলাচলের জন্য উন্নত ট্রেনের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য সংকেতব্যবস্থা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণকক্ষ, সঠিক যোগাযোগ এবং কঠোর পরিচালনবিধির সমন্বয় অপরিহার্য।

দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করবে তদন্ত। তবে প্রাথমিক তথ্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—রেল নিরাপত্তা শুধু দ্রুতগতির ট্রেনের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; ট্রেন, সংকেতব্যবস্থা ও মানুষের সিদ্ধান্তকে একসঙ্গে নিরাপদভাবে কাজ করতে হয়।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত