নিষেধাজ্ঞার আড়ালে অস্ত্রভান্ডার কীভাবে সচল রাখলো ইরান?

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম

যুদ্ধের ময়দানে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া কিংবা ড্রোন হামলা চালানোই সামরিক সক্ষমতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। এর পেছনে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, রাসায়নিক উপাদান, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, ভারী যানবাহন, অর্থ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা। প্রতিপক্ষের হামলায় উৎপাদনকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যদি এসব উপকরণ সংগ্রহের বিকল্প পথ চালু থাকে, তাহলে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা বা পুনর্গঠন করা সম্ভব।

ইরানের ক্ষেত্রে ঠিক এই বিষয়টিই সামনে এনেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, দেশটি ৫ হাজারের বেশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সংস্থার একটি গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী ট্রাক আমদানি করেছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই আমদানি চলেছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মধ্যেও। অর্থাৎ ইরানের সামরিক সক্ষমতার পেছনে শুধু নিজস্ব উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নের একটি জটিল ব্যবস্থাও কাজ করছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

৫ হাজার সংস্থার একই ঠিকানা, একই পরিচয়

রয়টার্স ইসরায়েলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ২৪০ অ্যানালিটিকসের সহযোগিতায় এই নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে। অনুসন্ধানে প্রায় ১৯ হাজার আমদানি-সংক্রান্ত নথি, ব্যাংক হিসাব, সরকারি রেকর্ড, কোম্পানি নিবন্ধন এবং জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

নেটওয়ার্কের সংস্থাগুলোর নামের শুরুতে রয়েছে ‘MOD’। এটি ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইংরেজি সংক্ষিপ্ত রূপ। ফারসি ভাষায় নামের শুরুতে ব্যবহৃত হয় ‘VODJA’। এর সঙ্গে পাঁচ বা ছয় অঙ্কের একটি নম্বর যুক্ত থাকে।

অস্বাভাবিক বিষয় হলো, এসব সংস্থার নিবন্ধিত ঠিকানা একই—তেহরানে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিক বিভাগের ঠিকানা। তাদের নথিতে প্রতিষ্ঠার তারিখও একই, ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় ঘটে।

কিন্তু করপোরেট নথি বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৩ সালে। সে সময় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের তেল রপ্তানি ও মুদ্রাবাজার বড় ধরনের সংকটে পড়েছিল।

এই মিলগুলো থেকে অনুসন্ধানকারীরা ধারণা করছেন, সংস্থাগুলো একটি সমন্বিত সামরিক ক্রয়ব্যবস্থার অংশ। অর্থাৎ বাইরে থেকে দেখতে অনেকগুলো পৃথক প্রতিষ্ঠান মনে হলেও তাদের নিবন্ধন, আর্থিক লেনদেন ও পণ্য আমদানির মধ্যে রয়েছে অভিন্ন যোগসূত্র।

নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল: অর্থের বদলে পণ্য

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার অন্যতম লক্ষ্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও আমদানি-রপ্তানি সীমিত করা। কিন্তু ইরানের এই নেটওয়ার্কের কার্যপদ্ধতি দেখায়, সরাসরি অর্থ স্থানান্তর না করেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা যায়।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে ‘মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সীমান্ত পেরিয়ে সরাসরি অর্থ পাঠানোর প্রয়োজন হয়নি।

এ ধরনের ব্যবস্থায় বিদেশে থাকা অর্থ ব্যবহার করে মধ্যস্থতাকারী বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য কেনা যায়। পণ্য সরবরাহের নথিতে প্রকৃত ক্রেতা বা ব্যবহারকারীর পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করা হলে নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার পক্ষে পুরো লেনদেনের যোগসূত্র শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ইরানের তেল বিক্রির অর্থ এসব লেনদেনের অর্থায়নে ব্যবহৃত হয়েছে। বিদেশে থাকা মধ্যস্থতাকারী ও শেল কোম্পানিগুলো এই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে সরঞ্জাম কিনে ইরানে পাঠিয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞা মানেই কোনো দেশের সব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নির্ভর করে অর্থের উৎস, প্রকৃত ক্রেতা, পণ্যের ব্যবহারকারী এবং পরিবহনপথ কতটা শনাক্ত করা যাচ্ছে তার ওপর।

এক সংস্থার আমদানি ২৩০ কোটি ডলার

রয়টার্সের অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে MOD 346428 নামের একটি সংস্থা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম আমদানি করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে রকেটের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক উপাদান, বিস্ফোরক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ভারী ট্রাক এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি।

একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এত বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম আমদানির তথ্য ইরানের সামরিক সরবরাহব্যবস্থার ব্যাপ্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। এটি শুধু অস্ত্র কেনার বিষয় নয়; বরং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শিল্পভিত্তি সচল রাখার প্রচেষ্টারও ইঙ্গিত দেয়।

এখানে একটি সংখ্যাগত পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। রয়টার্সের শিরোনামে পুরো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের আমদানির কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে MOD 346428 একক সংস্থার আমদানি ২৩০ কোটি ডলার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সময়সীমা, তথ্যভান্ডার ও হিসাবের পরিধি আলাদা হওয়ায় এ দুটি অঙ্ককে সরাসরি যোগ করা বা একই হিসাবের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

রকেটের জ্বালানি থেকে বিস্ফোরক: কী আমদানি করেছে ইরান?

ইরানের সামরিক উৎপাদনে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে বিশেষ রাসায়নিক উপাদান প্রয়োজন হয়। রয়টার্সের অনুসন্ধানে এসব উপাদান আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে MOD 346428 চীন থেকে ৮৮৬ টন রাসায়নিক পদার্থ আমদানি করে। চালানের নথিতে সোডিয়াম ক্লোরেট ও বিভিন্ন পারক্লোরেটের মতো রাসায়নিকের উল্লেখ রয়েছে। এগুলো কঠিন রকেট জ্বালানি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ববর্তী উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

এ ছাড়া নাইট্রোসেলুলোজ, বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ, ডেটোনেটর, টাইটানিয়াম এবং নির্ভুল যন্ত্রপাতি আমদানির তথ্যও উঠে এসেছে। এসব উপকরণের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কাঠামো, জ্বালানি ব্যবস্থা কিংবা বিস্ফোরক অংশ তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।

তবে সব পণ্যের সামরিক ব্যবহার নিশ্চিত নয়। অনেক উপাদানই দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য—অর্থাৎ বেসামরিক শিল্প, রাসায়নিক উৎপাদন বা অন্যান্য বৈধ কাজেও ব্যবহার করা যায়। এ কারণে শুধু পণ্যের নাম দেখে তার চূড়ান্ত ব্যবহার নির্ধারণ করা যায় না।

বন্দর বিস্ফোরণের সঙ্গে রাসায়নিক চালানের যোগসূত্র

২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল দক্ষিণ ইরানের শহীদ রাজায়ি বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে এই বিস্ফোরণের সঙ্গে সোডিয়াম পারক্লোরেটের একটি চালানের সম্ভাব্য যোগসূত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত দুই ব্যক্তির দাবি, বন্দরের কনটেইনারে থাকা সোডিয়াম পারক্লোরেটে আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাসায়নিকগুলো সংরক্ষণ করেছিল সিনা পোর্ট অ্যান্ড মেরিন সার্ভিসেস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি বুনিয়াদ মোস্তাজাফানের মালিকানাধীন। এটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ফাউন্ডেশন।

ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, সামরিক উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হলে দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে বিস্ফোরণের চূড়ান্ত কারণ হিসেবে কোনো সরকারি তদন্তের সিদ্ধান্তকে এই অনুসন্ধানের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।

ট্রাক যখন হয়ে ওঠে মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান

এই নেটওয়ার্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভারী যানবাহন আমদানি। MOD 346428 মোট ৪৩৫টি আইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সামরিক বাহিনী এ ধরনের ভারী ট্রাককে পরিবর্তন করে মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সাধারণ বাণিজ্যিক ট্রাকের কাঠামোর মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম বসিয়ে সেগুলোকে বাইরে থেকে সাধারণ যানবাহনের মতো দেখানো সম্ভব।

এ ছাড়া হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার পিকআপ আমদানির তথ্যও পাওয়া গেছে। আইআরজিসি এসব গাড়িতে ভারী মেশিনগান বসিয়ে সামরিক কাজে ব্যবহার করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২২ সালে কেনা ছয়টি আইভেকো ট্রাক শেষ পর্যন্ত সাহারা থান্ডার নামের একটি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছেছিল। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে।

আইভেকো জানিয়েছে, ইরানে তাদের গাড়ি থাকলে তা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণের বাইরে। টয়োটাও বলেছে, তারা ইরানে ব্যবসা করে না।

চীন, রাশিয়া ও ইউরোপের সরবরাহপথ

রয়টার্সের অনুসন্ধানে ইরানের সামরিক সরঞ্জামের উৎস হিসেবে চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশগুলোর নাম এসেছে।

চীন থেকে এসেছে রকেট জ্বালানির রাসায়নিক উপাদান ও টাইটানিয়াম। রাশিয়া থেকে এসেছে ডেটোনেটর। জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হয়েছে ভারী ট্রাক, বিমানের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম।

রাশিয়া থেকে ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচটি চালানে মোট ৭৬ লাখ ডলারের ডেটোনেটর এসেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ চালানটির মূল্য ছিল ১৯ লাখ ডলার।

তবে কোনো দেশের নাম পণ্য আমদানির নথিতে উৎস হিসেবে থাকা মানেই সেই দেশের সরকার সরাসরি ইরানের সামরিক কর্মসূচিকে সহায়তা করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক, মধ্যস্থতাকারী, প্রকৃত ক্রেতা এবং সরকারের ভূমিকা আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয়। আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে চীনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুক্ত করা কিংবা দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে বেইজিং।

নিষেধাজ্ঞা কি তাহলে ব্যর্থ?

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য শুধু ইরানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়; দেশটির সামরিক কর্মসূচিতে অর্থ ও প্রযুক্তির প্রবাহ সীমিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান বিকল্প অর্থায়ন ও আমদানি নেটওয়ার্ক চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এটি নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ ব্যর্থ—এমন প্রমাণ নয়। কারণ আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়া, সরবরাহে বিলম্ব, পণ্যের দাম বৃদ্ধি কিংবা নির্দিষ্ট প্রযুক্তি সংগ্রহে বাধা—এসব প্রভাবও নিষেধাজ্ঞার ফল হতে পারে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে মাসিক আমদানি ৪৭ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমেছিল। মে মাসে তা আবার বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছায়।

অর্থাৎ সরবরাহব্যবস্থা চাপের মুখে পড়লেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরান বিকল্প পথ ব্যবহার করে কিছু সরঞ্জাম সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ইরানি সরকারের অর্থনৈতিক লাইফলাইন বিচ্ছিন্ন করেছে এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর প্রচেষ্টা মোকাবিলায় তারা এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নিষেধাজ্ঞা কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি এই নেটওয়ার্ককে ইরানের সামরিক বাণিজ্যের ‘লাইফলাইন’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ব্যাংক সেপাহের নথি কীভাবে খুলে দিল রহস্য?

এই নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার পেছনে ছিল ইরানের ব্যাংক সেপাহের ফাঁস হওয়া নথি। ২৪০ অ্যানালিটিকসের অর্থনীতিবিদ নোয়াম বিনস্টক ২০২৫ সালের জুনে টেলিগ্রাম ও উইকিইরানে ছড়িয়ে পড়া এসব নথি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একই ধরনের নাম ও পরিচিতির হাজার হাজার হিসাব দেখতে পান।

নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ৩৬টি সংস্থার বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে ছিল ১২০ কোটি ডলার। অন্য সংস্থাগুলোর কাছে স্থানীয় মুদ্রায় ছিল প্রায় ১৮০ কোটি ডলার।

প্রতিটি সংস্থার ১১ অঙ্কের একটি স্বতন্ত্র সরকারি পরিচিতি নম্বর ছিল। সেই নম্বর ব্যাংক হিসাব, আমদানি চালান ও জাহাজের নথিতে বারবার পাওয়া যায়। ফলে বিদেশি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের আড়ালে থাকা লেনদেনেরও যোগসূত্র শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

রয়টার্স এই তথ্যের সঙ্গে প্রায় ১৯ হাজার আমদানি নথি, কোম্পানি নিবন্ধন, জাহাজ চলাচলের কাগজপত্র, স্যাটেলাইট ছবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও মিলিয়ে দেখে।

তবে অনুসন্ধানের সব তথ্য একই মাত্রায় যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কিছু চালানের ক্ষেত্রে পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ না থাকায় শুল্কসংক্রান্ত কোড ও ঘোষিত উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ফলে প্রতিটি পণ্যের চূড়ান্ত ব্যবহারকারী বা সামরিক প্রয়োগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

ইরানের সামরিক শক্তির পেছনে নতুন বাস্তবতা

এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খল—অর্থ, ব্যাংকিং, পরিবহন, কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, মধ্যস্থতাকারী ও উৎপাদন অবকাঠামো।

ইরানের গোপন সামরিক সরবরাহ নেটওয়ার্কের তথ্য দেখাচ্ছে, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মধ্যেও দেশটি বিকল্প বাণিজ্যপথ ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি, ব্যাংক হিসাব ও আমদানি নথির মধ্যে পাওয়া যোগসূত্র আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামনে এখন প্রশ্ন—কেবল অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনলেই কি সামরিক সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব, নাকি এর সঙ্গে যুক্ত অর্থায়ন, বিদেশি মধ্যস্থতাকারী, পরিবহন ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের সরবরাহব্যবস্থাকেও শনাক্ত করতে হবে?

রয়টার্সের অনুসন্ধান অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে: ইরানের সামরিক সক্ষমতার পেছনে দৃশ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি রয়েছে জটিল আর্থিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো। যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রের লড়াই যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই অস্ত্র তৈরির উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার অদৃশ্য লড়াইও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত