ভারতের রাজস্থান রাজ্যের শুষ্ক অঞ্চলে হঠাৎ যেন গড়ে উঠেছে এক টুকরো ‘কাশ্মীর’। চারদিকে বরফের মতো সাদা পাহাড়, ঢাল আর নীল পানির জলাশয়। নবদম্পতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে সিনেমা ও মিউজিক ভিডিও নির্মাতাদের নিয়মিত আনাগোনা সেখানে। প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করছেন জায়গাটিতে। কিন্তু এই মনোরম দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি।

স্থানটি ভারতের রাজস্থানের আজমের জেলার কিশানগড়ের একটি বিশাল মার্বেল বর্জ্য ফেলার জায়গা। স্থানীয়ভাবে ‘স্নো ইয়ার্ড’ নামে পরিচিত এই বর্জ্যভূমি এশিয়ার বৃহত্তম মার্বেল বর্জ্য ফেলার স্থান। প্রায় ৩০০ একর বা ১২১ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত জায়গাটিতে মার্বেল কাটাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বর্জ্য জমে তৈরি হয়েছে সাদা পাহাড়ের মতো স্তূপ। পানিতে ভরা গর্তগুলো দূর থেকে কৃত্রিম নীল হ্রদের মতো দেখায়। প্রবেশও বিনামূল্যে।
এখানে নবদম্পতিরা বিয়ের ছবি তোলেন, বিয়ের আগে ফটোশুটের আয়োজন করেন অনেক যুগল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতারা রিলস তৈরি করেন। এমনকি সিনেমা ও মিউজিক ভিডিওর শুটিংও হয় নিয়মিত।
উত্তর প্রদেশের ব্যবসায়ী সালিম শাহজাদা আল জাজিরাকে বলেন, তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ভাগনি থেকে শুরু করে মা—সবাই জায়গাটি খুব পছন্দ করেছেন। তাঁদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এটি দেখতে কাশ্মীরের মতো।’
তবে জায়গাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, এখানে মার্বেল কাটাইয়ের বর্জ্য ফেলা হয় এবং পাহাড়ের মতো সাদা স্তূপগুলোও সেই বর্জ্য দিয়েই তৈরি।
কিশানগড় মার্বেল ও গ্রানাইট শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান গ্রানাইট অ্যান্ড স্টোন ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, শহরটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০টি মার্বেল ও গ্রানাইট প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। এ খাতে প্রতিদিনের মোট ব্যবসার পরিমাণ ১৬ কোটি রুপির বেশি, যা প্রায় ১৭ লাখ ডলারের সমান। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ।
প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ট্যাংকারে করে এসব কারখানার বর্জ্য এনে সরকারি বরাদ্দ করা স্থানে ফেলা হয়। সেখানে প্রতিদিন জমা হয় প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টন মার্বেল স্লারি বা তরল বর্জ্য। শিল্পের এই বিপুল বর্জ্যই আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
কিশানগড়ের ভোগিয়াওয়াস গ্রামের বাসিন্দা ৫৩ বছর বয়সী কৃষক বাঘারাম গুর্জর বলেন, বর্জ্যের ধুলা জমিতে পড়লে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাঁর স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে কাশিতে ভুগছেন। বর্জ্য ফেলার স্থানটি আশপাশের অন্তত ছয়টি গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
গুর্জরের ভাষায়, ‘কত সমস্যার কথা আর বলব? এক-দুটি সমস্যা হলে সামাল দেওয়া যেত। কিন্তু এখানে বর্জ্য ফেলার কারণে প্রায় সবকিছুই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই বুকে সংক্রমণ, দাঁতের সমস্যা ও ত্বকের অ্যালার্জিতে ভুগছে।’
তিনি জানান, নিজের ও তাঁর স্ত্রীকে বুকের সংক্রমণ কিংবা ত্বকের সমস্যার জন্য নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়।
আজমেরের গঙ্গা নারায়ণ হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসক অদিতি গোয়াল বলেন, কিশানগড়ের বাসিন্দারা মূলত শ্বাসতন্ত্র ও ত্বকসংক্রান্ত নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে রয়েছেন। মার্বেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার শ্রমিকেরা দীর্ঘ সময় বিষাক্ত ধুলার সংস্পর্শে থাকায় দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে এলাকায় শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্জ্যভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়া ধুলার পাশাপাশি কৃষিজমির মাটি থেকেও ধুলাবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে ধুলা থেকে সুরক্ষায় মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বর্জ্যভূমি থেকে উড়ে আসা সূক্ষ্ম ধুলা আশপাশের কৃষিজমিতে জমে মাটিকে শক্ত করে তুলছে। এতে চাষাবাদ কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
রাজস্থান কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লক্ষ্মীকান্ত শর্মার নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় কিশানগড়ের মাটিতে সিসা সিলিকেটের উপস্থিতি স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এটি মারাত্মক দূষণের ইঙ্গিত।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্জ্যের কণাগুলোর আকার ৭৫ মাইক্রোমিটারেরও কম হওয়ায় সেগুলো বাতাসে ছড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত যেতে পারে। এতে মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব পরিবেশগত বায়ুমান নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। গবেষকদের আশঙ্কা, এলাকার অনেক মানুষ সিলিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ভোগিয়াওয়াস গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী বাসিন্দা উগম সিংয়ের মতে, মার্বেল স্লারি ফেলা শুরু হওয়ার পর থেকে এলাকার পরিবেশ ও মানুষের জীবন ধীরে ধীরে বদলে গেছে। তাঁর দাবি, বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানিও পান করার উপযোগী নেই।
তিনি বলেন, পানিতে ফ্লোরাইডের মাত্রা এত বেশি যে তা লবণাক্ত লাগে। তাঁর দাঁত ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং হাড় দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বর্জ্যভূমির আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা রাজস্থান রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, এসব আবেদনে কার্যকর সাড়া মেলেনি।
উগম সিং বলেন, ‘সরকারে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, দরিদ্র মানুষের কথা কেউ শোনে না। ধনীদের আরও ধনী করতে আমাদের মতো মানুষের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। মনে হয়, আমাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই।’
তিনি বলেন, তাঁদের একমাত্র দাবি—মার্বেল বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা হোক, যাতে তাঁরা আবার স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারেন এবং কৃষিজমি সবুজ ও উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে।
পরিবেশ আদালতের নির্দেশ, তবু বদলায়নি পরিস্থিতি
গত বছর স্থানীয় পরিবেশকর্মী দ্রুপদ মালিক কিশানগড়ের বর্জ্যভূমির স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে ভারতের জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।
ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে জানায়, অনিয়ন্ত্রিতভাবে মার্বেল স্লারি ফেলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি ও বায়ু দূষিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্থান রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডকে নিয়মিত নজরদারি, নমুনা পরীক্ষা এবং পরিবেশগত বিধি লঙ্ঘনকারী মার্বেল প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে কিশানগড়ে বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আল জাজিরা। তবে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
অধ্যাপক শর্মা বলেন, বর্জ্যভূমির আশপাশের এলাকাগুলো মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তাঁর গবেষণার ফল রাজ্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলেও পরিবেশগত পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘বর্জ্য ফেলার স্থানটি এমন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া জরুরি, যেখানে মানুষের বসবাস বা চলাচল নেই। এলাকাটি অত্যন্ত বিষাক্ত হয়ে উঠেছে এবং গুরুতর রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোনো সুরক্ষা মাস্ক ছাড়াই মানুষকে সেখানে ঘুরতে এবং এমনকি খাবার খেতেও দেওয়া হচ্ছে—এটি আমাকে বিস্মিত করে।’
দূষণ কমাতে মার্বেল স্লারি পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এই বর্জ্য টাইলস তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। এ জন্য টাইলস উৎপাদনকারী কারখানা স্থাপন করা হলে কিশানগড়ের দূষণ কিছুটা কমতে পারে।
ভোগিয়াওয়াস থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের দূরত্বে টোকরা গ্রামের বাসিন্দা রাম লালও বর্জ্যভূমি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কিশানগড় এখন মার্বেল বর্জ্যে ভরে গেছে। এমন জায়গায় বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা করা উচিত, যেখানে অন্তত আগামী দুই থেকে তিন দশক মানুষের জীবন বিপন্ন হবে না।
একই সঙ্গে দূষিত ধুলার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে বিনা মূল্যে চিকিৎসা শিবির স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, গ্রামের কোনো পরিবারের পক্ষেই হাজার হাজার রুপি ব্যয় করে গুরুতর রোগের চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়।
রাজস্থানের এই ‘স্নো ইয়ার্ড’ পর্যটকদের কাছে বরফে ঢাকা কাশ্মীরের মতো মনোরম দৃশ্য তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের পেছনে স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতিতে ‘আশার আলো’
ব্যারিস্টার ফুয়াদকে আদালতে তলব
হাইকোর্টে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন
ব্রিটিশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা ইরানের
পুলিশের ৭ কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত, একজন বাধ্যতামূলক অবসরে
গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বিজিবি মোতায়েন