যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের আসন ধরে রাখার লড়াই নয়, বরং তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক শক্তি, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের সক্ষমতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়।
ট্রাম্পের জন্য এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব কয়েকটি কারণে বিশেষ। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তাঁর প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক ও আইনগত বাধা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সংকীর্ণ। আসনসংখ্যায় দলটির অবস্থান ২১৮-২১৪। অন্যদিকে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি।
রয়টার্সের ২ নভেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের নেট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে। জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদ পুনর্দখলের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকলেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কংগ্রেসের তদন্ত ও নজরদারি। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব পাবে এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে শুনানি, নথি তলব ও তদন্ত পরিচালনার সুযোগ বাড়বে।
বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি, শুল্কনীতি, সরকারি ব্যয়, পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কংগ্রেসে আরও কঠোর প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
সিনেটের গুরুত্ব আরও ভিন্ন জায়গায়। যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ অনুমোদনে সিনেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিপাবলিকানরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা আটকে দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। বিচার বিভাগে নিয়োগ এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ পূরণেও রাজনৈতিক দরকষাকষি বাড়বে।
এ ছাড়া বাজেট, সরকারি ঋণের সীমা বৃদ্ধি এবং সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ বরাদ্দ নিয়ে দুই দলের মধ্যে বিরোধ তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে ২০২৭ সালে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার ঝুঁকির কথাও উঠে এসেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতি বড় নির্বাচনী ইস্যু
এবারের নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।
রয়টার্সের ২ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতি নিয়ে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাচনী সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
রয়টার্স/ইপসোসের সেপ্টেম্বরের এক জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন ছিল ৩২ শতাংশ। অন্যদিকে নেট সিলভারের সিলভার বুলেটিনের ২ নভেম্বরের জরিপ-সমন্বিত হিসাবে তাঁর অনুমোদনের হার ছিল ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ। জরিপ দুটি ভিন্ন সময় ও পদ্ধতির হওয়ায় সংখ্যাগুলোকে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। তবে উভয় তথ্যই ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে চাপের ইঙ্গিত দেয়।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ট্রাম্পের বাণিজ্য ও শুল্কনীতিও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা এসব ইস্যুতে প্রশাসনের নীতির সমালোচনা করে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।
যদিও মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের পদ নিয়ে সরাসরি ভোট হয় না, তারপরও এই নির্বাচনকে ট্রাম্পের প্রথম দুই বছরের শাসনামলের ওপর এক ধরনের রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় ঘটলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর নতুন রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে এগোনোর দাবি করতে পারবেন।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ চলে যাবে না। এমনকি কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেও তাঁর হাতে ভেটো ক্ষমতা এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বিভিন্ন নীতি পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকবে।
তবে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হলে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণের জন্য সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। ফলে শুধু প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নির্বাচনের রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে নয়।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে সামরিক ব্যয়, যুদ্ধের অর্থায়ন এবং প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়ে আরও বেশি জবাবদিহি দাবি করতে পারে। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এলেই ইরান বিষয়ে ট্রাম্পের নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক বিষয়ে প্রেসিডেন্টের উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে।
রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষ ধরে রাখলে আইন প্রণয়ন ও নিয়োগে সুবিধা, রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রস্তুতিকেও প্রভাবিত করবে। রিপাবলিকানদের ফল ভালো হলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তাঁর দলের পরবর্তী নির্বাচনী কৌশল শক্তিশালী হতে পারে। বিপরীতে বড় ধরনের পরাজয় হলে দলের ভেতরে নেতৃত্ব, নীতি ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে ভালো ফল করলে ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার সুযোগ পাবে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে না।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। কারণ এই নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে না, বরং তাঁর প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের মনোভাবও অনেকটা স্পষ্ট হবে।
রূপগঞ্জে পোশাক কারখানায় বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪
মার্কিন বিমানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দোহাই দিয়ে কেশম দ্বীপে হামলা
নির্বাচনের আগেই ট্রাম্পের পরাজয়!
বায়ুদূষণে বিশ্বের পঞ্চম অবস্থানে ঢাকা
'যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম' মন্তব্য করার পরই ইরানে হামলা চালালো ট্রাম্প