ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব ক্ষোভে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলো ডেমোক্র্যাটরা

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পরাজিত করে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ইরান যুদ্ধ, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এই ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। এর ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে তাঁর আইন প্রণয়ন ও নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কংগ্রেসে এখন থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর ডেমোক্র্যাটদের নজরদারি ও বিরোধিতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এপি জানায়, ডেমোক্র্যাটরা আইওয়া, কানসাস, টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, ওহাইও ও নর্থ ক্যারোলাইনাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের আসন দখল করেছে। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রভাবিত কিছু অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে।

নির্বাচনে আইওয়ায় রিপাবলিকান প্রার্থী অ্যাশলি হিনসনকে হারিয়ে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জশ টুরেক। কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন অ্যাডাম হ্যামিলটন।

টেক্সাসে রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। সাউথ ক্যারোলাইনায় ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। ওহাইওতে রিপাবলিকান জন হুস্টেডকে হারিয়েছেন সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেরড ব্রাউন। নর্থ ক্যারোলাইনায় উন্মুক্ত একটি আসনেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট রয় কুপার।

জর্জিয়ায় রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক কলিন্সকে হারিয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ। নিউ হ্যাম্পশায়ারে সাবেক সিনেটর জন সুনুনুকে পরাজিত করে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস।

এই ফলাফলগুলো রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ, কয়েকটি অঙ্গরাজ্যকে দলটি নিজেদের নিরাপদ নির্বাচনী এলাকা হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

সিনেটের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের হারিয়ে তারা আসনসংখ্যা বাড়িয়েছে।

নিউ জার্সিতে রিপাবলিকান টম কিনকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট রেবেকা বেনেট। পেনসিলভানিয়ায় রিপাবলিকান রায়ান ম্যাকেঞ্জি, স্কট পেরি ও রব ব্রেসনাহানও পরাজিত হয়েছেন। নর্থ ক্যারোলাইনা ও কেনটাকির কয়েকটি উন্মুক্ত আসনেও জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ডেমোক্র্যাটদের নিট তিনটি আসন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। এপি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে ছিল। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তখনো গণনা ও ফল ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছিল।

এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষের প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক চাপ। এপির ভোটার জরিপ অনুযায়ী, ভোটারদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট। প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার অর্থনীতিকে ভালো নয় বা খারাপ বলে মূল্যায়ন করেছেন। প্রতি ১০ জনের প্রায় আটজন জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি তাঁদের পরিবারে মাঝারি বা তীব্র আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি দুর্নীতিকে ভোটারদের বড় অংশ তাঁদের ভোটের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ইরান যুদ্ধও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পেছনে অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, জ্বালানির দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ তাঁর দলের নির্বাচনী অবস্থানকে দুর্বল করেছে বলে এপির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্প দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিও ভোটারদের সমর্থন সর্বজনীন ছিল না। জরিপে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন অর্ধেকের কিছু কম ভোটার।

নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের দায় নিজের ওপর নিতে চাননি ট্রাম্প। পশ্চিম উপকূলের ভোটকেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না। আর যদি থাকতাম, তাহলে আমরা বিপুল ব্যবধানে জিততাম।’

নির্বাচনের আগে ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি এমনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন তিনিই নির্বাচনে প্রার্থী।

অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও প্রত্যাশিত ফল পায়নি। নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের দল এমন কিছু অঙ্গরাজ্য ও নির্বাচনী এলাকায় প্রচার জোরদার করেছিল, যেখানে দুই বছর আগে তিনি বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য শুধু আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাধা নয়, প্রশাসনিক জবাবদিহির ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

কংগ্রেসের কমিটিগুলোর নেতৃত্ব ও তদন্ত কার্যক্রমে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে। প্রতিরক্ষা বিভাগ, ইরান যুদ্ধ, সরকারি ব্যয়, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে শুনানি ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

প্রতিবেদনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের কর্মকাণ্ডও সম্ভাব্য তদন্তের আলোচনায় আসতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সাংবিধানিক ক্ষমতা বহাল থাকবে। তিনি ডেমোক্র্যাটদের পাস করা কোনো বিলে ভেটো দিতে পারবেন। ট্রাম্প আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটদের নীতিগত কর্মসূচি তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে তিনি ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। এতে ওয়াশিংটনে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকিম জেফরিস সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হলে ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার সুযোগ পাবেন। তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কঠোর নজরদারিকে কেন্দ্র করে প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচির কথা জানিয়েছেন।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য দলটির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের রাজনৈতিক অবস্থানও শক্তিশালী করতে পারে। বিপরীতে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ রিপাবলিকান নেতাদের জন্য ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরির পথ জটিল হতে পারে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে এপির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করে দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ের নীতিগত কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP), ৪ নভেম্বর ২০২৬।

এমএজেড
আরও পড়ুন