তাহলে কি এবার সত্যিই ইসরায়েলের পথ ধরবেন ট্রাম্প?

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

আমেরিকায় মানুষ তাঁকে আর পছন্দ না করলে ইসরায়েলে চলে যাবেন, এমনকি দেশটির প্রধানমন্ত্রীও হয়ে যাবেন—এমন মন্তব্য করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তাহলে কি নিজের কথামতো এবার ইসরায়েলের পথে হাঁটবেন ট্রাম্প? নেতানিয়াহুর কাছ থেকে কি দায়িত্ব বুঝে নেবেন? নাকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন আপাতত ফক্স নিউজের টেলিফোন সাক্ষাৎকারেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যখন নতুন হিসাব-নিকাশ চলছে, তখন ট্রাম্পের পুরোনো সেই মন্তব্য নিয়ে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের দিনই ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

৩ নভেম্বর (মার্কিন স্থানীয় সময়) ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনে কথা বলার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েলে তাঁর জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ। এরপরই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যদি কখনো আমার ওপর বিরক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমি ইসরায়েলে চলে যাব এবং প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাব।’

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের বিরক্তি আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রিত্ব—ট্রাম্পের বক্তব্যে যেন এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা!

তবে তাঁর বক্তব্যটি ছিল রসিকতামূলক মন্তব্য, নির্বাচনে হারলে ইসরায়েলে চলে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নয়। এ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক চুক্তি কিংবা ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকেও তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাবের তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কার খবর এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের শাসনামলে আইন প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে।

তবে এখানে একটি ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হিসাব আছে। এটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়, মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্প নিজে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হননি। তাঁর দল কংগ্রেসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ফলে হোয়াইট হাউস ছেড়ে যাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা তাঁর তৈরি হয়নি।

তাহলে ইসরায়েলে যাওয়ার সময় কি এখনো হয়নি? নাকি ট্রাম্পের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এখনো যথেষ্ট বিরক্ত হননি?

ট্রাম্পের রসিকতা বাস্তবে রূপ নিতে চাইলে তাঁকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর থেকে বিমানে উঠলেই হবে না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য দেশটির নিজস্ব নাগরিকত্ব, নির্বাচনী আইন এবং সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার শর্ত পূরণ করতে হবে।

ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, নেসেট বা দেশটির সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার মূলত ইসরায়েলি নাগরিকদের। সাধারণভাবে প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হয় এবং আইনে নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতাও পূরণ করতে হয়।

ইসরায়েলের সরকারি নাগরিকত্ববিষয়ক নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণভাবে বিদেশি নাগরিকের নাগরিকত্ব পেতে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নির্দিষ্ট সময় বসবাস, হিব্রু ভাষার জ্ঞান এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টিও দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। দেশটির সংসদ নেসেটের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম এমন সরকার গঠনের মধ্য দিয়েই প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত হন।

অর্থাৎ, ট্রাম্পের কথিত ৯৯ শতাংশ জনপ্রিয়তা থাকলেও সেটি দিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসার কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেই।

বর্তমানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ইরান যুদ্ধসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে দুই নেতার অবস্থান ও যোগাযোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচিত।

মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা বলছেন, তখন নেতানিয়াহুর কাছেই রয়েছে দেশটির সরকার পরিচালনার দায়িত্ব।

তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই। বরং এটি তাঁর আত্মপ্রচারমূলক রসিকতার ধারাবাহিকতা বলেই মনে হয়।

এর আগেও ২০১৯ সালে অভিশংসন নিয়ে বিতর্কের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কিছু ঘটলে তিনি ইসরায়েলে গিয়ে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী হয়ে যেতে পারেন। ২০২২ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। ২০২৬ সালের মে মাসেও তিনি বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব শেষ হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

আপাতত তেমন কোনো লক্ষণ নেই। ট্রাম্প এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের পরাজয় তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেয়নি। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

তবে নির্বাচনের ফল তাঁর প্রশাসনের রাজনৈতিক হিসাব বদলে দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে সিনেট যাওয়ায় তাঁকে আগামী দুই বছর কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিকত্ব, নির্বাচনী যোগ্যতা এবং নেসেটের সমর্থন অর্জনের কোনো প্রক্রিয়াই ট্রাম্প শুরু করেছেন—এমন তথ্য নেই।

সুতরাং আপাতত নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তবে ট্রাম্পের বক্তব্য ধরে ব্যঙ্গ করে বলা যায়, আমেরিকার কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর তাঁর জন্য ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন করে জায়গা খোঁজার চিন্তা মাথায় আসতেই পারে!

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়—যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা ট্রাম্পকে কতটা পছন্দ করেন, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে; কিন্তু ইসরায়েলের ৯৯ শতাংশ সমর্থনের দাবির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার টিকিট পাওয়া যাবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইসরায়েলের ভোটার ও সংসদকেই।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আলাবামা ডটকম, ফক্স নিউজ, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ইসরায়েলের নেসেট এবং ইসরায়েল সরকারের নাগরিকত্ববিষয়ক সরকারি ওয়েবসাইট।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত