যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পর ইরান মনে করছে, যুদ্ধের ব্যয় বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে ফেলার কৌশল কাজে এসেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং মার্কিন ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব—সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চাপে পড়েছে। তবে এই কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করা গেলেও ইসরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ কমেনি।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এর বিশ্লেষক লাজার বারম্যানের এক নিবন্ধে এমন মূল্যায়ন উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সামরিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়লেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে টিকে থাকার যে পরিকল্পনা ইরান করেছিল, তা আংশিকভাবে সফল হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও কানসাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নির্বাচনের ফলের পর ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা সন্তোষ প্রকাশ করেন। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘আমেরিকানরা যুদ্ধকে না বলেছে, আমরাও এই বার্তাকে সমর্থন করি।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের অভিযোগ, ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে একটি বেআইনি ও ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়েছে। তাঁর ভাষায়, ওয়াশিংটনের হিসাব ও কৌশলগত ধারণা ব্যর্থ হয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের ভুল ছিল। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটার জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
নিবন্ধের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে—এটি দেশটির নেতৃত্ব আগে থেকেই বিবেচনায় রেখেছিল। তাই তাদের পরিকল্পনা ছিল, সামরিক ক্ষতি সত্ত্বেও যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে প্রতিপক্ষের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
এ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ইরান জাহাজ চলাচলে হামলা এবং মাইন পেতে রাখার দাবি করে দীর্ঘ সময় ধরে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ রাখে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে জ্বালানি ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের দাম বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারে অর্থনৈতিক চাপ তৈরির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়ে। লেখকের মতে, মার্কিন ভোটারদের ওপর চাপ তৈরির জন্য ইরান এই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগাতে চেয়েছিল।
ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকেও চাপে রাখার কৌশল নেয় বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আরব দেশে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা কাতারও শতাধিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে পড়েছিল বলে নিবন্ধে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি সামরিক ঘাঁটি বা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম থাকা স্থাপনায় ১১৫টি হামলার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব হামলার পর পেন্টাগন ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগ সরঞ্জামসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপকরণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বলে লেখকের দাবি।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, অক্টোবরের শেষ নাগাদ যুদ্ধসংশ্লিষ্ট অভিযানে ২৩ মার্কিন সেনা নিহত এবং ৮৬৫ জন আহত হয়েছিলেন। তবে লেখকের মূল্যায়নে, এসব হতাহতের ঘটনা মার্কিন জনমতে ততটা প্রভাব ফেলেনি, যতটা ফেলেছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অর্থনৈতিক সংকট।
ভ্যান্সের বক্তব্যে ইরানের কৌশলের প্রতিফলন?
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’
তিনি কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কও অন্যতম কারণ ছিল বলে মন্তব্য করেন। নিবন্ধের লেখকের মতে, ভ্যান্সের এই বক্তব্য ইরানের জন্য রাজনৈতিকভাবে স্বস্তিদায়ক।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ভ্যান্সের মূল্যায়নের একটি বড় অংশকে সত্য বলে স্বীকার করেছেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধই একমাত্র সমাধান হতে পারে।
অর্থাৎ নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ইরান নিয়ে সামরিক বিকল্প পুরোপুরি বাদ দেননি ট্রাম্প।
ইসরায়েল কেন এখনো অনড়?
ইরানের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জনমত ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেললেও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে একই ফল আসেনি বলে মনে করছেন নিবন্ধের লেখক।
তাঁর মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো ইসরায়েল জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের একই মাত্রার মুখে পড়েনি। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক দায় হয়ে ওঠেনি।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে এক মাসের যুদ্ধের পর ইসরায়েলের তিন-চতুর্থাংশের বেশি ইহুদি নাগরিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে পরিচালিত জরিপে প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোটার মনে করেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধ করতে হতে পারে। প্রায় ৪০ শতাংশ আগাম হামলার পক্ষেও মত দিয়েছেন।
এ ছাড়া ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরাও ইরানকে প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছেন এবং যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ ইসরায়েলের গোয়েন্দা সক্ষমতা। নিবন্ধে বলা হয়েছে, দুই দফা যুদ্ধে ইরানের বহু শীর্ষ নেতাকে হত্যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইসরায়েলের ভূমিকা বেশি ছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্যের বরাত দিয়ে লেখক দাবি করেছেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৫ সালের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’-এর আগে ইরানের ভেতরে গোপন ড্রোন ঘাঁটি স্থাপনের ঘটনাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিবন্ধের ভাষ্য অনুযায়ী, জুনের শুরু থেকে ইরান ইসরায়েলে হামলা এড়িয়ে চলছে। তবে ইসরায়েল আবার যুদ্ধে জড়ালে তাদের হাতে আরও গোপন কৌশল থাকতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে ইসরায়েলকে থামাতে চায় তেহরান?
লেখকের বিশ্লেষণে, ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এক ধরনের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের সমাধান ইসরায়েলের অনমনীয়তার কারণে হচ্ছে না—এমন ধারণা মার্কিন রাজনৈতিক আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
এর ফলে ইসরায়েল নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করতে চাইলে ট্রাম্প তা থামানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এমন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন লেখক।
সব মিলিয়ে নিবন্ধের মূল্যায়ন হলো, ইরান সামরিকভাবে দুর্বল হলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে টিকে থাকার কৌশলে কিছুটা সফল হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের নিরাপত্তা-উদ্বেগ, সামরিক প্রস্তুতি ও জনসমর্থন এখনো তেহরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফল ইরানের জন্য স্বস্তির বার্তা হলেও যুদ্ধের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
বায়ুদূষণে শীর্ষে লাহোর, ঢাকার অবস্থান কতো?
নির্বাচনে হারের পেছনে কারণ 'জ্বালানির দাম': মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিশ্ববাজারে ফের বাড়লো তেলের দাম
ডেমোক্র্যাট নারীদের ঐতিহাসিক সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হিলারি ক্লিনটন