ইরানের ওপর নৌ অবরোধের পাশাপাশি এবার স্থলসীমান্ত ও কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে দেশটির পণ্য ও প্রযুক্তি সরবরাহের পথ সীমিত করতে নতুন ‘আয়রন গেট’ টাস্কফোর্স গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তবে ইরানের সাতটি স্থল প্রতিবেশী, কাস্পিয়ান সাগরে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না বলে মনে করছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সি।
সংস্থাটির রোববার (৮ নভেম্বর) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েক মাসের নৌ অবরোধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় নতুন টাস্কফোর্স গঠনকে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লোরিডার টাম্পায় প্রায় ২০ জন সামরিক ও বেসামরিক কর্মী নিয়ে কাজ করবে ‘আয়রন গেট’। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানে উন্নত অস্ত্র, দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি এবং নিষেধাজ্ঞাভুক্ত পণ্য সরবরাহের পথ সীমিত করাই এর লক্ষ্য।
সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেছেন, এ উদ্যোগ ইরানের অর্থায়ন, অস্ত্রশিল্প পুনর্গঠন এবং সামরিক মজুত পুনরায় পূরণের সক্ষমতা কমিয়ে দেবে। সেন্টকমের দাবি, নৌ অবরোধের ফলে এ পর্যন্ত ইরানের ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আটকে দেওয়া হয়েছে। তবে মেহর নিউজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘আয়রন গেট’ গঠনকে ইরানের ওপর পূর্ণাঙ্গ অবরোধ আরোপের নতুন সামরিক সক্ষমতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সামরিক পথে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সীমাবদ্ধতার পর ওয়াশিংটন চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার বাড়াতে চাইছে।
সমুদ্র থেকে স্থলসীমান্তে চাপের বিস্তার
মার্কিন কৌশলের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো চাপ প্রয়োগের ভৌগোলিক ক্ষেত্র সম্প্রসারণ। সমুদ্রপথে বিধিনিষেধের পাশাপাশি এবার ইরানের বিকল্প বাণিজ্যিক ও সরবরাহ রুটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেহর নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২২ অক্টোবর ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে ইরাক ও পাকিস্তানের সীমান্তে বিধিনিষেধ এবং তুরস্ক সীমান্তে ট্রাক চলাচলে বিলম্বের বিষয় উঠে এসেছিল। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আয়রন গেট’ ঘোষণার আগেই স্থলপথে চাপ সৃষ্টির বিষয়টি আলোচনায় ছিল।
তবে ভৌগোলিক তথ্যের বরাতে বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, ইরানের সাতটি দেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত রয়েছে। এসব সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ হাজার ৮৯৪ কিলোমিটার। এর পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগরে দেশটির প্রায় ৭৪০ কিলোমিটার উপকূল রয়েছে। এত বিস্তৃত এলাকায় কার্যকর নজরদারি চালাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা, শুল্ক নিয়ন্ত্রণ, নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য এবং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা সরাসরি সেন্টকমের নিয়ন্ত্রণে নেই।
প্রতিবেশীদের সহযোগিতা ছাড়া কঠিন
ইরানের স্থলপথে বাণিজ্য সীমিত করতে হলে ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও তুর্কমেনিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। কিন্তু এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির নির্বাহক নয়। প্রত্যেকের নিজস্ব অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। কোনো কোনো দেশের জন্য ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
সীমান্ত ও বাণিজ্যপথ ব্যাপকভাবে বন্ধ করলে প্রতিবেশী দেশগুলোর নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইরাক ও পাকিস্তানের সীমান্তে সাম্প্রতিক বিধিনিষেধের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, বাইরের চাপ থাকলেও সীমান্ত পরিস্থিতি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর নির্ভরশীল। তাই ফ্লোরিডায় একটি টাস্কফোর্স গঠনের অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব স্থলপথ নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করতে পারবে।
কাস্পিয়ান সাগরে আইনি বাধা
‘আয়রন গেট’ পরিকল্পনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ কাস্পিয়ান সাগর। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মতো এটি উন্মুক্ত সমুদ্র নয়। ইরান, রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান এই পাঁচটি দেশ কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলীয় রাষ্ট্র। ২০১৮ সালে পাঁচ দেশের স্বাক্ষরিত কাস্পিয়ান সাগরের আইনি মর্যাদাসংক্রান্ত কনভেনশনের তৃতীয় অনুচ্ছেদের ষষ্ঠ ধারায় উপকূলীয় নয়, এমন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের সপ্তম ধারায় অন্য কোনো উপকূলীয় দেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের জন্য সদস্য দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই আইনি কাঠামো কাস্পিয়ান সাগরে সরাসরি মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তৎপরতা, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে এ অঞ্চলের বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারলেও সেটিকে বাস্তব নৌ অবরোধে রূপ দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
২০ জনের টাস্কফোর্স বনাম বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক
রয়টার্সের বরাতে মেহর নিউজ জানিয়েছে, ‘আয়রন গেট’-এ প্রায় ২০ জন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা থাকবেন। টাম্পায় অবস্থিত এই ইউনিট ইরানের সীমান্তে মোতায়েন কোনো সামরিক বাহিনী নয়; বরং মার্কিন বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের একটি কাঠামো। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত, লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এ টাস্কফোর্স ইরানের বাণিজ্য ব্যয় বাড়াতে পারে। কিন্তু বিস্তৃত ভূখণ্ড, বহুমুখী অর্থনীতি এবং অসংখ্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যুক্ত একটি বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সব সরবরাহপথ শনাক্ত ও বন্ধ করা প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সমন্বয়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল কাজ।
সামরিক চাপের পর অর্থনৈতিক অবরোধের পথে?
মেহর নিউজের বিশ্লেষণে ‘আয়রন গেট’কে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর চাপ প্রয়োগের কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। সামরিক পদক্ষেপে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না হলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং সরবরাহ ও বাণিজ্যপথ সীমিত করা বিকল্প কৌশল হয়ে উঠতে পারে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন টাস্কফোর্স গঠনকে সামরিক ও নৌচাপের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সংঘাতের বড় অংশ অর্থনীতি, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে সংবাদমাধ্যমটি। তবে চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা এবং সেই চাপকে রাজনৈতিক বা কৌশলগত সাফল্যে রূপ দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতিগুলোও অতীতে এই ব্যবধানের মুখে পড়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ অবরোধ কতটা সম্ভব?
সব মিলিয়ে ‘আয়রন গেট’কে ইরানের স্থল ও সমুদ্রপথে পূর্ণাঙ্গ অবরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছে মেহর নিউজ। টাস্কফোর্সটি নির্দিষ্ট কিছু সংবেদনশীল পণ্য, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যপথে বিধিনিষেধ তৈরি করতে পারে। এতে ইরানের লেনদেনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। কিন্তু দেশটির সব সীমান্ত ও সরবরাহপথ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক শনাক্ত করলেই চলবে না; প্রতিবেশী দেশগুলোর ধারাবাহিক সহযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে। এ সহযোগিতা পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাই ইরানের ভৌগোলিক, আইনি, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘আয়রন গেট’-এর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অবরোধের লক্ষ্য অর্জন কঠিন। পরিকল্পনাটি কিছু বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যাহত করতে পারলেও এককভাবে ইরানকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করার সক্ষমতা রাখে না, এমনটাই বিশ্লেষণটির মূল বক্তব্য।
পাকিস্তানের আকাশসীমায় এবার ‘এক চীন নীতি’
রিয়াদের আরামকো টাওয়ারে হুথিদের মিসাইল হামলা
ইয়েমেনে সেনা পাঠাচ্ছে না সিরিয়া
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন ডানা হোয়াইট
রুশ ডিজেল কিনতে অনাগ্রহী মার্কিন ব্যবসায়ীরা, সাগরে ঘুরছে ট্যাংকার
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দৃশ্য টিভিতে দেখে কেঁদেছিলাম: সোনিয়া গান্ধী