বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির নেতারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থাকে ‘অত্যন্ত সংকটময়’ বলে জানিয়েছেন। গভীর রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় করেন তাদের অনেকে। এতে দেশের আপামর জনগণ রাতভর গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকেন। তাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করে স্ট্যাটাস দেন সাধারণ জনগণ। তবে রাত পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালের ফটকে কমেনি মানুষের অপেক্ষা।
জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ফুসফুসে সংক্রমণ থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর দেখা দেয় নিউমোনিয়া। এর সঙ্গে রয়েছে কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের পুরোনো সমস্যা। ফলে পরিস্থিতি এমন— একটি রোগের চিকিৎসা দিতে গেলে আরেকটির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সম্ভব হলে দ্রুত সিঙ্গাপুরে নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা করছেন।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করে তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যেন কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে। প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে সরকার প্রস্তুত। গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া জাতির জন্য ভীষণ রকম অনুপ্রেরণা। তার সুস্বাস্থ্য দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে রাজধানী’র এভারকেয়ার হাসপাতালে সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও খোঁজখবর রাখায় বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রহমান।’
এদিকে, শুক্রবার দিবাগত রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল লিখেছেন, ‘এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছিলাম। এখনি ফিরলাম। বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একদমই ভালো না। সবাই দোয়া করবেন উনার জন্য।’
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএনপির চেয়ারপার্সনের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান জানান, খালেদা জিয়া সিসিইউতে মেডিকেল বোর্ডের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে রাতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন।
এ ছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির সংবাদে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তার সার্বিক শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে আমরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি। মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আন্তরিক আরজ— আল্লাহ তা'য়ালা যেন তাঁকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা দান করেন, সকল কষ্ট সহজ করে দেন এবং তাঁর জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দেন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে রোগব্যাধি ও বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
এর আগে, রাত সাড়ে ৮ টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভেরিফায়েড পেজ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। পোস্টে তিনি খালেদা জিয়ার সুস্থ্যতা কামনা করেন।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে খালেদা জিয়াকে নিয়ে পোস্ট দেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। তিনি লিখেন, কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক নেতার সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা হয় নাই। ছোটবেলা থেকে একটাই ইচ্ছা ছিল- বেগম জিয়া পরম মমতায় আমার মাথায় হাত রেখে একটু দোয়া করে দিবেন কোনোদিন। ওনাকে রহম করো খোদা।
এদিকে, রাত ১২টার পর খালেদা জিয়ার অবস্থা নিয়ে হাসপাতালে ফটকে দাঁড়িয়ে মঈন খান সাংবাদিকদের বলেন, মেডিক্যাল বোর্ড তার সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করেছে। যা যা দরকার, তারা করছেন। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া, গভীর রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দেশের মানুষের কাছে বিশেষ দোয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, আমরা একটু দূরত্ব রেখে কথা বলেছি। ম্যাডাম আমাদের চিনতে পেরেছেন। আমাদের সালামের রিপ্লাই দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত হাসপাতালে ভিড় করেছেন বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুধু খবর জানার চেষ্টা- হাসপাতালের ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। এ অবস্থায় চিকিৎসায় যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে- তাই হাসপাতালের ভেতরে ভিড় না করার অনুরোধ করেন বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।
এর আগে, দুপুরে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর উপসস্থিতিতে রাজধানীর নয়াপল্টন জামে মসজিদে দোয়ার আয়োজনে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সংকটময় বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়।
প্রসঙ্গত, প্রায় ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও কিডনি জটিলতাসহ নানা রোগে ভুগছেন। গত ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ২৭ নভেম্বর দুপুরে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কায় তাকে সিসিইউতে নেওয়া হয়।
মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য জানান, বয়সজনিত কারণে সুস্থ হতে সময় লাগছে। সিসিইউতে নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। লন্ডন থেকে ডা. জুবাইদা রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরাও ভার্চুয়ালি বোর্ডের আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রক্ষায় বেগম জিয়া ছিলেন আপোসহীন