বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার, ৭ বছরে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী

বিদেশে ভালো চাকরি কিংবা নতুন জীবনের আশায় পাড়ি দিয়ে অনেক বাংলাদেশি নারী পড়ছেন নির্যাতন ও প্রতারণার ফাঁদে। গত সাত বছরে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে প্রায় ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে ব্র্যাক।

অভিবাসন-সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় দালালদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে নির্যাতন, শোষণ ও প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন।

তাদের একটি বড় অংশ বিদেশে গিয়ে নানা ধরনের নির্যাতন ও শোষণের মুখে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্যান গোউয়ে ও ইয়াং জিকু নামে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল, রানী আক্তার ও মালিনা মারাক নামে দুই নারীকে প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কের মাধ্যমে চীনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তারা। বিমানবন্দরে ওই দুই নারী চীনে যেতে অস্বীকৃতি জানালে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে।

এরপর ২০২৫ সালের ২৮ মে একই ধরনের অভিযোগে আরও দুই চীনা নাগরিক হু জানজুন ও জিয়াং লিজিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশি নাগরিকরা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রামের নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। কয়েক মাস কথাবার্তার পর তারা বাংলাদেশে এসে পরিবারের আস্থা অর্জন করেন। পরে বিয়ের মাধ্যমে নারীদের বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে নেওয়ার পর তাদের বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

সম্প্রতি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরে এক নারী বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন। তার অভিযোগ, মাসে এক লাখ টাকা বেতনে কাস্টমার কেয়ারে চাকরির কথা বলে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। এ ঘটনায় রাজবাড়ীর মো. রুবেল, ফরিদপুরের আনিসুর রহমান ও গাজীপুরের বেলাল হোসেনের নাম এসেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়ার জন্য ওই নারীর কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা নেওয়া হয়। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও ডলার নিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সেখানে তাকে নির্যাতন এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে পালিয়ে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তায় দেশে ফেরেন ওই নারী।

প্রায় একইভাবে সৌদি আরবেও চাকরির প্রলোভনে গিয়ে এক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে আটকে রেখে মারধর, খাবার না দেওয়া এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের অনেকেই নির্যাতন, শোষণ ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহও দেশে ফিরেছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীদের দ্রুত আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পাচারকারীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রেম, বিয়ে কিংবা চাকরির প্রলোভনে নারী পাচার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দূতাবাস ও অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার আগে ভিসা, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে নারীদের সচেতন করা জরুরি।