ডিজেল ও বিদ্যুতের বাড়তি দামে সেচের খরচ যখন কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশ হয়ে উঠেছে, তখন সৌরশক্তিচালিত পাম্পে স্বস্তির পথ খুঁজে পেয়েছেন ঝিনাইদহের অনেক কৃষক। সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কাজে লাগিয়ে জমিতে পানি দেওয়ায় কমছে সেচের ব্যয়। কেউ কেউ নিজের জমির প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আশপাশের জমিতে সেচ দিয়ে বাড়তি আয়ও করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলার ঝিনাইদহ সদর, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলায় এরই মধ্যে ৩৬টি সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় তিনটি, কোটচাঁদপুরে একটি এবং মহেশপুরে ৩২টি পাম্প রয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলার অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) কারিগরি সহায়তায় রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশনের (আরআরএফ) বাস্তবায়নাধীন ‘স্মার্ট’ প্রকল্পের আওতায় এসব পাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমানো।
সোলার পাম্প ব্যবহারকারী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিজেলচালিত পাম্পের তুলনায় সৌরচালিত পাম্পে সেচ দিতে খরচ কম পড়ে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় যেসব কৃষক সেচ ব্যয় নিয়ে চাপে ছিলেন, তাঁদের জন্য এ ব্যবস্থা বিকল্প হিসেবে কাজ করছে।
আরআরএফের কর্মকর্তারা জানান, প্রচলিত ব্যবস্থায় এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হতো। সোলার পাম্প ব্যবহারে একই পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে খরচ নেমে এসেছে প্রায় ২০০ টাকায়। ফলে প্রতি বিঘায় প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হচ্ছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, তাঁর সোলার পাম্প স্থাপনে মোট ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে আরআরএফের ‘স্মার্ট’ প্রকল্প থেকে তিনি ৪৫ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন।
হাবিবুর রহমান বলেন, সোলার পাম্প চালুর পর সেচের জন্য আগের মতো ডিজেল বা বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। নিজের জমিতে পানি দেওয়ার পর আশপাশের কৃষকদের জমিতেও সেচ দিতে পারছেন। এতে নিজের সেচ ব্যয় কমার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মহেশপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকাতেও সৌরচালিত পাম্পের ব্যবহার কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ফুলচাষে নিয়মিত সেচের প্রয়োজন হওয়ায় এ প্রযুক্তি উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
মহেশপুরের কৃষক সাদিকুল রহমান জানান, সীমান্তবর্তী এলাকায় ফুলচাষীদের নিয়ে প্রথমবারের মতো এ ধরনের কার্যক্রম শুরু করেছে আরআরএফ। প্রকল্পের ঋণ ও অনুদানের সহায়তায় তিনি সোলার পাম্প স্থাপন করেছেন। বর্তমানে নিজের জমিতে সেচ দেওয়ার পাশাপাশি আশপাশের প্রায় ১৫ বিঘা জমিতেও পানি সরবরাহ করছেন।
সাদিকুল রহমান বলেন, নিজের জমির সেচের চাহিদা পূরণের পর অন্য কৃষকদের জমিতে পানি দিয়ে বাড়তি আয় করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে।
একই এলাকার ফুলচাষী গফুর মিয়ারও একই অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, সোলার পাম্প স্থাপনের পর সেচের জন্য তেল ও বিদ্যুতের পেছনে আগের মতো অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না। নিজের জমির পাশাপাশি অন্য কৃষকদের জমিতে সেচ দিয়ে অতিরিক্ত আয় করতে পারছেন তিনি। এতে ফুলচাষের উৎপাদন ব্যয়ও কমছে।
আরআরএফের সিনিয়র সহকারী পরিচালক কৃষিবিদ ড. অসিত বরণ মণ্ডল বলেন, পিকেএসএফের সহায়তায় ‘স্মার্ট’ প্রকল্পের আওতায় ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় ৩৬টি সোলার পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রযুক্তির প্রতি কৃষকদের আগ্রহও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে আরও ১০০টির বেশি সোলার পাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকের সেচ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির প্রসার ঘটানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
অসিত বরণ মণ্ডল আরও বলেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হলেও সোলার পাম্পে তা প্রায় ২০০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ায় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কমবে।