সঠিক সময়ে খাবার খেলে কী সত্যিই উপকার হয়?

সুস্থ থাকতে শুধু কী খাচ্ছেন, তা-ই নয়, কখন খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে মিল রেখে খাবার খেলে বিপাকীয় স্বাস্থ্য, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ, ঘুম এবং ওজন ব্যবস্থাপনায় উপকার পাওয়া যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে দিনের শুরুতে খাবার খাওয়া এবং রাতে তুলনামূলক আগেভাগে রাতের খাবার শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই খাদ্যাভ্যাসকে বলা হয় ‘সার্কাডিয়ান ইটিং’ বা ‘সার্কাডিয়ান ফাস্টিং’। এর মূল ধারণা হলো, শরীরের স্বাভাবিক দিন-রাতের ছন্দের সঙ্গে খাবার খাওয়ার সময়ের সামঞ্জস্য রাখা। তবে এ পদ্ধতির সব স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

শরীরের জৈবিক ঘড়ি কীভাবে কাজ করে?

মানবদেহে প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ রয়েছে, যা ঘুম, জেগে থাকা, হরমোনের কার্যক্রম এবং বিপাকসহ শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্কের একটি কেন্দ্রীয় জৈবিক ঘড়ি এই ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। সকালের সূর্যের আলোসহ পরিবেশের বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে এটি শরীরের সময়চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখে।

দিনের বেলায় শরীরকে সক্রিয় রাখা এবং রাতে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের জন্য প্রস্তুত করাও এই ব্যবস্থার কাজ।

ওরেগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব নার্সিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং স্লিপ, ক্রোনোবায়োলজি অ্যান্ড হেলথ ল্যাবরেটরির পরিচালক অ্যান্ড্রু ডব্লিউ. ম্যাকহিলের মতে, দিনের তুলনামূলক আগের সময়ে খাবার খেলে যকৃৎ ও অন্ত্রের মতো পরিপাকতন্ত্রের অঙ্গগুলোর কার্যক্রম মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

অন্যদিকে, রাতে অনেক দেরিতে খাবার খেলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে খাবার গ্রহণের সময়ের অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। কারণ, ওই সময়ে শরীর সাধারণত ঘুম ও বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়।

অনিয়মিত সময়ে খেলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?

ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মিরেইল সিরলি বলেন, শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে দৈনন্দিন কাজের সময়ের অসামঞ্জস্য বিভিন্ন রোগের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে খাবার খেলে শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অ্যান্ড্রু ম্যাকহিলের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, একই পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করলেও ভুল সময়ে খাবার খাওয়া ইঁদুরের ওজন বাড়তে পারে। এসব গবেষণায় অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

তবে প্রাণীর ওপর গবেষণার ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না।

মানুষের ক্ষেত্রে পালাক্রমে কাজ করা কর্মীদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের মধ্যে স্থূলতা, ইনসুলিন প্রতিরোধ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। এসব কর্মীর অনেককে শরীরের স্বাভাবিক বিশ্রামের সময়ে জেগে থাকতে ও খাবার খেতে হয়, যা জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে।

সিরলির মতে, খাবার ছাড়া কিছু সময় থাকা শরীরের কোষের রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর একটি হলো ‘অটোফ্যাজি’। এ প্রক্রিয়ায় কোষের ক্ষতিগ্রস্ত বা অপ্রয়োজনীয় উপাদান ভেঙে পুনর্ব্যবহার করা হয়।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, শরীর যখন ঘুম ও বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকে, তখন যকৃৎকে হঠাৎ ভারী খাবার হজমের কাজ করতে হলে শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।

আগেভাগে খাবার খেলে কী সত্যিই উপকার হয়?

শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবার খেলে ঠিক কতটা স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়া যায়, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে প্রাথমিক কিছু গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।

এসব গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের তুলনামূলক আগের সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস ইনসুলিনের কার্যকারিতা, রক্তচাপ, শরীরে চর্বির পরিমাণ এবং রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদ অ্যামি শাহ বলেন, এ বিষয়ে অধিকাংশ গবেষণা সীমিতসংখ্যক মানুষের ওপর এবং স্বল্প সময় ধরে পরিচালিত হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো পর্যাপ্ত নয়।

নারী ও পুরুষের শরীরে এ খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব একই কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি সম্ভাব্য উপকারিতা শুধু খাবার খাওয়ার সময়ের কারণে হচ্ছে, নাকি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার সীমিত রাখায় মোট ক্যালরি গ্রহণ কমে যাচ্ছে, তা নির্ধারণ করাও কঠিন।

ম্যাকহিলের মতে, এর পেছনে শরীরের জৈবিক ঘড়ির ভূমিকা থাকতে পারে। আবার খাবার গ্রহণের সময়সীমা কমে যাওয়ার কারণেও উপকার হতে পারে। এমনকি দুটি কারণ একসঙ্গেও কাজ করতে পারে।

কারা এই খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে পারেন?

সিরলির মতে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার অভ্যাস বিশেষ করে স্থূলতা বা বিপাকীয় স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে—এমন কিছু মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে।

অ্যামি শাহ নিজেও এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন এবং তাঁর অনেক পরামর্শগ্রহীতাকে এটি অনুসরণের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, যাঁদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে মেনোপজের আগের পরিবর্তনশীল সময় বা মেনোপজ-পরবর্তী পর্যায়ে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

তবে এ পদ্ধতি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। যাঁদের শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও শক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তাঁদের খাবার গ্রহণের সময় বা পরিমাণ সীমিত করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁদের এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—

  • বর্তমানে বা অতীতে খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক ব্যাধিতে ভুগেছেন এমন ব্যক্তি।
  • ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তি।
  • গর্ভবতী ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান এমন নারী।
  • শিশু-কিশোর।
  • বয়স্ক ব্যক্তি।
  • ক্রীড়াবিদসহ যাঁরা নিয়মিত উচ্চমাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করেন।

ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট এবং দ্বৈত জিআইপি/জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট শ্রেণির ওষুধ গ্রহণকারীদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সিরলি। এসব ওষুধ ক্ষুধা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে খাবার গ্রহণের সময়সীমা আরও সীমিত করলে প্রয়োজনীয় শক্তি ও প্রোটিনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পেশির ভর ধরে রাখতে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে খাবেন যেভাবে

বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ হলো, দিনের বেলায় খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, দিনে তিন বেলা নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং মাঝখানে অতিরিক্ত নাশতা কমানো। পাশাপাশি রাতের খাবার আগেভাগে শেষ করে এমন সময়সীমা রাখা যেতে পারে, যাতে খাবার গ্রহণের বাইরে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিরতি থাকে। তবে এ সময়সূচি সবার জন্য উপযুক্ত নয়; ব্যক্তির বয়স, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির চাহিদা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দিনের শেষ ভাগে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমাতে সকালে পর্যাপ্ত প্রোটিনযুক্ত নাশতা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সিরলি।

তাঁর মতে, দিনের শুরুর দিকে শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা তুলনামূলক বেশি থাকে। অর্থাৎ, এ সময়ে শরীর রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক ভালোভাবে কাজ করতে পারে। দিনের শেষ ভাগে অতিরিক্ত শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ তাই কিছু মানুষের জন্য অনুকূল নাও হতে পারে।

বোস্টন ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিষয়ক কর্মসূচির ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক জোয়ান সালগে ব্লেক বলেন, ওজন ব্যবস্থাপনার জন্য দিনের শুরুর দিকে তুলনামূলক বেশি ক্যালরি গ্রহণ এবং দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা কমিয়ে আনার পক্ষে কিছু গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তবে প্রত্যেকের শরীরের জৈবিক ছন্দ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। তাই সবার জন্য একই খাবারের সময়সূচি সমান কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সকালে ও সন্ধ্যায় একই ধরনের খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রায় পার্থক্য হচ্ছে কি না, তা জানতে গ্লুকোজ মনিটরিং সেন্সর ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সিরলি। তবে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে করা উচিত।

অ্যামি শাহের মতে, কোন সময়সূচি শরীরের জন্য বেশি উপযোগী, তা বুঝতে কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে খাবারের অভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার আগে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে ওজন নিয়ন্ত্রণ বা পুষ্টির মান উন্নত করার লক্ষ্য থাকলে নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছেন জোয়ান সালগে ব্লেক।

সূত্র: হেলথ ডট কম