আকাশজুড়ে কালো মেঘ। কখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, কখনো মুষলধারে বর্ষণ। বৃষ্টির ফোঁটায় ধুয়েমুছে ঝকঝকে সবুজে সেজেছে পাহাড়ের গা। দূরের পাহাড় ঢেকে যাচ্ছে সাদা মেঘের চাদরে, আবার মুহূর্তেই মেঘ সরে উঁকি দিচ্ছে সবুজ পাহাড়। পাহাড়ি ছড়ার স্বচ্ছ পানির কলকল শব্দ আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে চারপাশে তৈরি হয়েছে মায়াবী এক পরিবেশ। প্রকৃতির এমন অপরূপ রূপ দেখতে চাইলে এই বর্ষায় শেরপুরের গারো পাহাড় হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অনন্য এক গন্তব্য।
শহরের ব্যস্ততা, যানজট আর কোলাহল পেছনে ফেলে কয়েকটি দিন প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটাতে চান যারা, তাদের জন্য বর্ষার গারো পাহাড় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া পাহাড়, শাল গজারি বনের ঘন সবুজ, মেঘের লুকোচুরি, পাহাড়ি ছড়া ও ঝরনার ছন্দ সব মিলিয়ে এ সময় গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য হয়ে ওঠে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা।
মেঘের দেশখ্যাত মেঘালয়ের সীমান্ত ঘেঁষে শেরপুরের বিস্তীর্ণ গারো পাহাড় অঞ্চল। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার এবং ময়মনসিংহ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে এর অবস্থান। বর্ষা নামতেই পাহাড়ি জনপদটির প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। সবুজে ঢাকা পাহাড় আর বনভূমির মাঝে বৃষ্টির স্নিগ্ধতা তৈরি করে এক মোহময় পরিবেশ।
শাল-গজারি বনের ভেতর দিয়ে হাঁটলে কানে আসে নানা পাখির ডাক। কখনো চোখে পড়ে কাঠবিড়ালির ছোটাছুটি, আবার কখনো বনের নীরবতা ভেঙে শোনা যায় অচেনা কোনো পাখির কণ্ঠ। পাতার ওপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, ভেজা মাটির গন্ধ আর বনের শীতল বাতাস প্রকৃতিপ্রেমীদের এনে দেয় এক অন্যরকম প্রশান্তি।
বর্ষার অন্যতম আকর্ষণ পাহাড়ি ছড়া ও ঝরনা। বৃষ্টির পানি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে তৈরি করে অসংখ্য ছোট বড় ছড়া। কোথাও পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে চলে স্বচ্ছ পানির ধারা, কোথাও আবার পাহাড়ের কোলে জমে ওঠে ছোট্ট জলধারা। পানির কলকল শব্দের সঙ্গে মেঘের আনাগোনা আর চারপাশের ঘন সবুজ মিলে তৈরি করে মনোমুগ্ধকর এক দৃশ্যপট।
শহরে বর্ষা অনেকের কাছে জলাবদ্ধতা, কাদা আর ভোগান্তির নাম হলেও পাহাড়ে বর্ষা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি। এখানে বৃষ্টি মানেই পাহাড়ের রং বদলে যাওয়া, বনভূমির সবুজ আরও গাঢ় হয়ে ওঠা আর মেঘের সঙ্গে পাহাড়ের লুকোচুরি। বৃষ্টিভেজা এই প্রকৃতি কিছু সময়ের জন্য হলেও মানুষকে ভুলিয়ে দিতে পারে নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি।
শেরপুর জেলার ব্র্যান্ডিং স্লোগান ‘পর্যটনের আনন্দে, তুলশী মালার সুগন্ধে’। আর এই পর্যটন সম্ভাবনার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে গারো পাহাড়। নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা, বারোমারী মিশন ও মধুটিলা ইকোপার্ক, ঝিনাইগাতী উপজেলার সন্ধ্যাকূড়া রাবার বাগান, গজনী সীমান্ত সড়ক, গজনী অবকাশ কেন্দ্র ও অবকাশ পিকনিক স্পট, শ্রীবরদী উপজেলার রাজার পাহাড়, হাড়িয়াকোনা পাহাড়সহ আশপাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান বর্ষায় ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণ করে।
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে গেলে কখনো চোখে পড়বে সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের সারি, কখনো ঘন বন আর কখনো দূরের মেঘে ঢাকা পাহাড়। বিশেষ করে বৃষ্টির পর পাহাড়ের সবুজ যখন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে, তখন পুরো গারো পাহাড় যেন প্রকৃতির আঁকা জীবন্ত কোনো ছবি হয়ে ওঠে।
পর্যটকদের আবাসনের সুবিধা বাড়াতে জেলায় বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের একটি মোটেল নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর পাশাপাশি গজনী এলাকায় ‘বনরাণী’ নামে একটি রিসোর্টে রাতযাপনের সুযোগ রয়েছে। পাহাড়ের নীরবতা, বৃষ্টির শব্দ আর শীতল পরিবেশে সেখানে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতাও হতে পারে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া শেরপুর শহরের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে থেকেও দিনের বেলায় গারো পাহাড়ের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি।
শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, ‘গারো পাহাড়ের গজনী অবকাশ কেন্দ্রে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের টিম রয়েছে। এছাড়াও ঝিনাইগাতী থানা পুলিশ ও নালিতাবাড়ী থানা পুলিশ বিজিবির সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করছে।’
বর্ষার মেঘ, বৃষ্টির ধারা আর পাহাড়ের সবুজ এই তিনের মিলনে শেরপুরের গারো পাহাড় এখন যেন প্রকৃতির এক বিশাল ক্যানভাস। কখনো মেঘে ঢাকা পাহাড়, কখনো বৃষ্টির শব্দে মুখর বন, আবার কখনো ছড়ার স্বচ্ছ পানিতে ভেসে ওঠা সবুজের প্রতিবিম্ব প্রতিটি মুহূর্তেই এখানে রয়েছে নতুন কোনো দৃশ্যের হাতছানি।
তাই নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে প্রকৃতিকে একটু কাছ থেকে অনুভব করতে চাইলে এবারের বর্ষায় ঘুরে আসতে পারেন বৃষ্টিভেজা গারো পাহাড়ে। মেঘ, বৃষ্টি, পাহাড় আর সবুজের এই অপূর্ব মেলবন্ধন হয়তো আপনার ভ্রমণের স্মৃতিতে হয়ে থাকবে দীর্ঘদিনের এক সুন্দর অধ্যায়।