’একজন আমেরিকান সেনার পা ইরানে পড়লে আমরা তা কেটে দেব’

ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সেনা প্রবেশ করলে কঠোর সামরিক প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান শুরু করলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত।

ইরানের সেনাবাহিনীর স্থলবাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী জাহানশাহী গত ৯ আগস্ট বলেন, কোনো মার্কিন সেনা ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে ‘নির্ণায়ক ও প্রতিরোধমূলক’ জবাব দেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, ‘একজন আমেরিকান সেনার পা ইরানে পড়লে আমরা তা কেটে দেব।’

ইরানি সেনাবাহিনীর এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে সম্ভাব্য স্থল অভিযান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ইরানের কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন, আকাশ ও সমুদ্রপথে হামলার পাশাপাশি মার্কিন সেনারা যদি সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, তাহলে সংঘাতের ধরন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করবে।

আগস্টে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি জানিয়েছিলেন, ইরান প্রয়োজনে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানে যেতে প্রস্তুত। একই সময়ে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্রও বলেছিলেন, বিদেশি সেনাদের ইরানের ভূখণ্ডে অবতরণ ঠেকাতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

জাহানশাহী বলেন, ইরানের স্থলবাহিনী সম্ভাব্য বিভিন্ন ধরনের স্থল হুমকি মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, সীমান্ত এলাকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী, বিশেষ ইউনিট, ড্রোন, আর্টিলারি ও সাঁজোয়া ইউনিট মোতায়েন রয়েছে।

ইরানি সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তে বিদেশি বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করার ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।

ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর আগেও সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। মার্চে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছিলেন, মার্কিন সেনারা স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, মার্কিন সেনাদের ইরানের মাটিতে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে ইরানি বাহিনী।

এ ছাড়া ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের তৎকালীন প্রধান আলী লারিজানি সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান নিয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান এ ধরনের পদক্ষেপের মোকাবিলায় প্রস্তুত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও তখন বলেছিলেন, ইরানে স্থল অভিযান হলে তা মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

কেন স্থল অভিযান নিয়ে এত উদ্বেগ?

ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তৃত ভূখণ্ড এবং পার্বত্য অঞ্চলকে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়। আগস্টে আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, দক্ষিণাঞ্চল ও হরমুজ প্রণালীর আশপাশের এলাকায় বিদেশি সেনা অবতরণের সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান বিভিন্ন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সরাসরি বড় আকারের স্থল অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। বরং ১৭ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শেষের দিকে এগোচ্ছে এবং তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কথাও জানিয়েছেন।

এর মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের মার্কিন ব্যয় ৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের হিসাব উদ্ধৃত করে Reuters জানিয়েছে। যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারেও চাপ তৈরি হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীর অস্থিতিশীলতার ফলে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

ফলে ইরানে সরাসরি স্থল অভিযান হলে শুধু সামরিক সংঘাতই নয়, এর সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই মূলত একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র যদি আকাশ বা সমুদ্রপথের বাইরে ইরানের ভূখণ্ডে সেনা পাঠায়, তেহরান সেটিকে নতুন মাত্রার সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং ব্যাপক সামরিক প্রতিরোধের প্রস্তুতি রাখছে।