জাতিসংঘে আব্বাসকে ভিডিও বক্তব্যের অনুমতি যুক্তরাষ্ট্রের

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে যোগ দিতে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ইইউর কূটনৈতিক বিভাগের মুখপাত্র আনোয়ার এল আনৌনি বলেন, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা দুঃখিত। জাতিসংঘের সদর দপ্তরের আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব ও জাতিসংঘের সঙ্গে বিদ্যমান সদর দপ্তর চুক্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ওয়াশিংটনকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে ইইউ।

আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু হওয়ার কথা। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসসহ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) কয়েকজন কর্মকর্তার ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরও এক বছর বহাল রাখার ঘোষণা দেয়। এটি টানা দ্বিতীয় বছর, যখন ফিলিস্তিনি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সরাসরি অংশগ্রহণে ভিসা-সংক্রান্ত বাধা তৈরি হলো। গত বছরও আব্বাস নিউইয়র্কে যেতে পারেননি এবং ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ পরিষনে বক্তব্য দিয়েছিলেন।

ভিসা নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কারণ হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের কিছু কর্মকাণ্ড শান্তির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ওয়াশিংটন আরও অভিযোগ করেছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধকে এগিয়ে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েল-সংক্রান্ত পদক্ষেপকেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মার্কিন প্রশাসন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অর্থনৈতিক সহায়তা ব্যবস্থারও সমালোচনা করেছে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার জন্য দণ্ডিত বা নিহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারকে অর্থ দেওয়ার আগের ব্যবস্থা নিয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে। আব্বাস সরাসরি নিউইয়র্কে উপস্থিত হতে না পারলেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তাকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে।

বৃহস্পতিবারের ভোটে প্রস্তাবটির পক্ষে ১৫২টি দেশ ভোট দেয়, বিপক্ষে ছিল ৩টি, আর ৪টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। এর ফলে আব্বাস আগামী অধিবেশনে ভিডিওর মাধ্যমে বক্তব্য দিতে পারবেন। একই ব্যবস্থার আওতায় আগামী এক বছর ভ্রমণে বাধার মুখে পড়লে উচ্চপর্যায়ের ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারাও জাতিসংঘের নির্দিষ্ট সভা বা সম্মেলনে ভিডিওর মাধ্যমে অংশ নিতে পারবেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মুখপাত্র বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের কাজে ফিলিস্তিনের পূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে হওয়ায় আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন গুতেরেস।

১৯৪৭ সালের জাতিসংঘ সদর দপ্তর চুক্তিতে জাতিসংঘের কাজে অংশ নিতে প্রতিনিধিদের নিউইয়র্কে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা না দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতার কথা বলে আসছে।

ইইউর কূটনৈতিক বিভাগের মুখপাত্র আনোয়ার এল আনৌনি বলেন, জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান চুক্তি ও আয়োজক দেশ হিসেবে তার দায়িত্বের আলোকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। ইইউর এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ২০ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে ইইউর পক্ষে বক্তব্য দেবেন।

ফলে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের ভিসা ইস্যু এবার জাতিসংঘের অধিবেশনের আগেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন তার ভিসা নিষেধাজ্ঞার পক্ষে রাজনৈতিক ও আইনি কারণ তুলে ধরছে, অন্যদিকে ইইউ ও জাতিসংঘের মহাসচিব ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের জাতিসংঘের কার্যক্রমে পূর্ণ অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে আনছেন।