ইরান যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর আঞ্চলিক দেশগুলোর জ্বালানি পরিবহননির্ভরতা কমাতে বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে এই উদ্যোগের।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ) সোমবার মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তাদের এবং সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। রয়টার্সও WSJ-এর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, তবে তারা এর বিষয়বস্তু স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ৫ বিলিয়ন ডলার দেবে। একই পরিমাণ অর্থ দেওয়ার জন্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, ইরাক ও জর্ডান—এই আটটি দেশকে আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে মোট ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত তহবিলের নাম ‘পার্টনারশিপ ফর অ্যালাইড ট্রাস্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ (Pact)। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (DFC) পরিচালনা করতে পারে বলে WSJ জানিয়েছে।
পাইপলাইন ও শোধনাগার পুনর্গঠনে অর্থ
এই তহবিল থেকে ইরান যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন, তেল শোধনাগার, তেলক্ষেত্র এবং অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনে অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
WSJ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত মাস ধরে চলা সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ডজন শোধনাগার, তেলক্ষেত্র ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। অবকাঠামো পুনর্গঠনে দশ বিলিয়ন ডলারের বেশি, অর্থাৎ কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।
সৌদি আরবের বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থাও সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশটির আরও বেশি তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহনের প্রয়োজন পড়েছে এবং এরই মধ্যে ট্যাংকারের চাহিদা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
হরমুজের বিকল্প পথ তৈরির লক্ষ্য
প্রস্তাবিত তহবিলের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালির বিকল্প নিরাপদ পথ ও অবকাঠামো তৈরি করা।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের পরও হরমুজ দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প রুট নিয়ে কাজ করছে।
তবে সব দেশের পরিস্থিতি এক নয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বিকল্প স্থলপথ ও পাইপলাইন ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোর হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক বেশি। ফলে প্রস্তাবিত প্রকল্পে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও দেশগুলোর স্বার্থ ভিন্ন হতে পারে।
শান্তিচুক্তির আগে পুনর্গঠন নিয়ে উদ্বেগ
তবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন কর্মকর্তা এই পরিকল্পনা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তাদের যুক্তি, তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান বা শান্তিচুক্তি হওয়ার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি স্থাপনা পুনর্গঠন করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কারণ নতুন করে নির্মিত বা মেরামত করা অবকাঠামো আবারও ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে পুনর্গঠনের পরও একই স্থাপনা আবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রস্তাবটি এখনো আলোচনাধীন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলায় এর শর্ত ও কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে। এমনকি কোন কোন দেশ শেষ পর্যন্ত তহবিলে অংশ নেবে এবং কবে তা বাস্তবায়ন হবে—সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও রপ্তানি পথের এই পুনর্বিন্যাস শুধু আঞ্চলিক অর্থনীতির বিষয় নয়; এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে। হরমুজ ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোও বিকল্প উৎস ও পরিবহনপথ খুঁজছে।