ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিয়ে পেজেশকিয়ানকে বশে আনতে চাইছেন ট্রাম্প

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে গিয়ে একের পর এক চাপ ও হুমকির মুখে পড়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমঝোতায় না এলে ইরানকে দ্রুত ‘ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে ইসরায়েলের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন দাবি করেছেন, ইরানের শীর্ষ নেতারা কোথায় অবস্থান করছেন, তা ইসরায়েল জানে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা হবে, নাকি দেশটিকে দ্রুত ‘ধ্বংস’ করা হবে—এ নিয়ে তাকে একটি ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনাও উঠে আসে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনে ট্রাম্প বলেন, “ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হবে, যাতে তারা পুনর্গঠন করে আগের চেয়েও শক্তিশালী দেশ হতে পারে—নাকি আমি ইসলামিক রিপাবলিককে দ্রুত ধ্বংস করব?” একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি আগামী নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

তবে ট্রাম্পের কঠোর হুমকির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিউইয়র্কে যোগাযোগ হয়েছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্প বৈঠকটিকে ‘খুব ভালো’ বলে বর্ণনা করলেও জানান, বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা ছিলেন না।

ট্রাম্পের হুমকির পাশাপাশি ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন ইসরায়েলের জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন।

মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড্যানন দাবি করেন, ইসরায়েল জানে ইরানের নেতারা কোথায় অবস্থান করছেন এবং তারা কী করছেন।

তিনি বলেন, “আমরা জানি নেতারা কোথায় লুকিয়ে আছেন। আমরা জানি তারা কী করছেন। আমরা জানি তারা কী বলছেন।”

ড্যানন আরও বলেন, ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলা চালালে দেশটির নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করতে ইসরায়েলের খুব বেশি সময় লাগবে না। তাঁর ভাষায়, “তারা যদি ইসরায়েলের ওপর হামলা করে, তাহলে তাদের কাছে পৌঁছাতে আমাদের মাত্র কয়েক দিন সময় লাগবে।”

তবে ইরানের শীর্ষ নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে ড্যাননের এই দাবির স্বাধীন কোনো যাচাই প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

নিউইয়র্কে পেজেশকিয়ানের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সরাসরি বৈঠক। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের সঙ্গে পেজেশকিয়ানের বৈঠকের সম্ভাবনার কথা জানানো হলেও তেহরানে এ নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে।

ইরানের রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী মহলের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি, চলমান সংঘাত ও মার্কিন সামরিক চাপের মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করলে সেটিকে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের সাফল্য হিসেবে দেখানো হতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের মধ্যপন্থী ও কূটনৈতিক মহলের কেউ কেউ মনে করছেন, যুদ্ধের মধ্যেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে তারা আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখছেন।

এই পরিস্থিতিতে পেজেশকিয়ানকে একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে।

ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দেওয়ার পরও ট্রাম্প প্রশাসন কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। নিউইয়র্কে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠক তারই প্রমাণ।

মার্কিন বিশেষ দূত উইটকফ জানিয়েছেন, দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করেছেন। আলোচনাটি ‘গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক’ হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

অর্থাৎ একই সময়ে দুটি ভিন্ন বার্তা সামনে আসছে—একদিকে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ ও সামরিক পদক্ষেপের হুমকি, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা।

হরমুজ প্রণালিও এই কূটনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। চলমান সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় তাই যুদ্ধের অবসানের পাশাপাশি হরমুজ পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিউইয়র্ক সফরে পেজেশকিয়ানের সামনে এখন একাধিক চাপ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁকে ইরানের অবস্থান তুলে ধরতে হচ্ছে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার পথও খোলা রাখতে হচ্ছে। আবার দেশে তাঁকে এমন কোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলতে হচ্ছে, যা রক্ষণশীল মহলের কাছে ছাড় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ট্রাম্পের ‘ধ্বংস’ করার হুমকি এবং ড্যাননের ইরানি নেতৃত্বকে লক্ষ্য করার সতর্কবার্তার পাশাপাশি আলোচনার উদ্যোগও চলছে। ফলে নিউইয়র্কে পেজেশকিয়ানের সফর শুধু জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখন মূল প্রশ্ন—তেহরান মার্কিন চাপের মুখে আলোচনায় কতটা এগোবে, আর ওয়াশিংটন সামরিক হুমকির পাশাপাশি কূটনীতির জন্য কতটা রাজনৈতিক পরিসর রাখবে। নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি নতুন প্রচেষ্টা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।