তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগ্রি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় কথিত নূহ (আ.)-এর নৌকার সন্ধানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে নৌকার ধ্বংসাবশেষ বলে দাবি করা হয়ে আসা জাহাজসদৃশ ভূতাত্ত্বিক কাঠামোটি এখন বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাদেরও আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।
তুরস্কের সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক জেঙ্কার আতিলার নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে। মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোনসও এ প্রকল্পে যুক্ত রয়েছেন। একই সময়ে তিনটি ব্রিটিশ ও মার্কিন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা দল ওই এলাকায় গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ের দৃশ্য ধারণ করছে। এসব দলের মধ্যে বিশ্বখ্যাত অভিযাত্রী ও টেলিভিশন উপস্থাপক বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলও রয়েছে।
১৯৫৯ সালে সন্ধান
দোগুবায়াজিতের তেলচেকের গ্রামের কাছে অবস্থিত এই অস্বাভাবিক কাঠামোটি প্রথম শনাক্ত করেন তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার। ১৯৫৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পূর্ব আনাতোলিয়ার আকাশপথে জরিপের সময় তোলা ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি কাঠামোটির সন্ধান পান।
এরপর থেকেই এলাকাটি নূহ (আ.)-এর নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে। তবে কয়েক দশকের অনুসন্ধানের পরও বৈজ্ঞানিকভাবে নূহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ হিসেবে কাঠামোটিকে নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
রাডারে মিলেছে ভূগর্ভস্থ অসামঞ্জস্য
সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এবারের অনুসন্ধানে GPS প্রযুক্তি, দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ম্যাপিং, ভূগর্ভস্থ রাডার এবং কোর ড্রিলিং ব্যবহার করেছেন।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাডার স্ক্যানে মাটির নিচে কয়েকটি ফাঁকা স্থান ও সমকোণীয় কাঠামোর মতো অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। এগুলোর কিছু অংশ সম্ভাব্য করিডর বা কক্ষের মতো বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। এসব এলাকায় কোর ড্রিলিং করে মাটির নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।
এবারের মাঠপর্যায়ের গবেষণায় প্রায় ২০ জন বিজ্ঞানী পাঁচটি দেশের হয়ে প্রায় ৯০ দিন কাজ করেছেন। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় এক হাজার মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোনস জানিয়েছেন, কোর ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ধারাবাহিক মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে কাঠামোটির প্রকৃতি কী এবং সেখানে মানুষের তৈরি কোনো উপাদান বা প্রাচীন জৈব পদার্থের চিহ্ন রয়েছে কি না।
মাটিতে বেশি জৈব পদার্থ
সাম্প্রতিক পরীক্ষায় কাঠামোটিকে ঘিরে নতুন একটি তথ্য সামনে এসেছে। গবেষকদের দাবি, জাহাজসদৃশ অংশের মাটিতে আশপাশের এলাকার তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি জৈব পদার্থ পাওয়া গেছে।
গবেষক জোনস জানান, ২০২৪ সালের একটি মাটি পরীক্ষাতেও কাঠামোর ভেতরের মাটি ও আশপাশের পাহাড়ের মাটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গিয়েছিল। নতুন করে সংগৃহীত নমুনাগুলোতে পচে যাওয়া কাঠ, প্রাণীর অবশেষ কিংবা মানুষের কর্মকাণ্ডের কোনো চিহ্ন রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তবে বেশি জৈব পদার্থ পাওয়া যাওয়াকে নূহ (আ.)-এর নৌকার প্রমাণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে দেখছেন না গবেষকেরা। এর প্রকৃত কারণ জানতে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
‘নূহের নৌকা’ এখনো প্রমাণিত নয়
নূহ (আ.)-এর নৌকার সঙ্গে এই কাঠামোর সম্পর্কের দাবি বহু বছর ধরে আলোচিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কাঠের অবশেষ, পেরেক বা নিশ্চিতভাবে মানুষের তৈরি বস্তু পাওয়া যায়নি বলে তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো ফলাফলও এখন পর্যন্ত পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়নি।
গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক জেঙ্কার আতিলা নিজেও নূহ (আ.)-এর নৌকা নিশ্চিতভাবে আবিষ্কারের দাবিকে বিভ্রান্তিকর বলে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমানে পাওয়া নমুনাগুলোতে জৈব অবশেষ রয়েছে কি না এবং সেগুলোর বয়স কত—তা নির্ধারণে পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। কার্বন পরীক্ষার ফল পেতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।
অর্থাৎ রাডারে ভূগর্ভস্থ অসামঞ্জস্য, মাটিতে তুলনামূলক বেশি জৈব পদার্থ কিংবা সম্ভাব্য কক্ষের মতো কাঠামো পাওয়া গেলেও এগুলোকে সরাসরি নূহ (আ.)-এর নৌকার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
তিন ধর্মের মানুষের আগ্রহ
নূহ (আ.)-এর কাহিনি ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মসহ আব্রাহামিক ধর্মীয় ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত নূহস আর্ক স্ক্যানসের লরেন উইটজকে বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে কাঠামোটির প্রকৃতি নির্ধারণ করাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
তাঁর মতে, নূহ (আ.)-এর নৌকা মুসলিম ও খ্রিষ্টান উভয় ধর্মীয় ঐতিহ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ধর্মের মানুষের কাছে স্থানটি আগ্রহের কেন্দ্র হতে পারে।
এদিকে গবেষণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাদের উপস্থিতি দোগুবায়াজিতের প্রতি নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরি করেছে। তুরস্কের ফিল্ম কমিশনের সভাপতি ও প্রযোজক সাইত ইয়ারদিমচি বলেছেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক নির্মাণ স্থানীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে বিশ্বের দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে পারে।
চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষা
গবেষকেরা জানিয়েছেন, সংগৃহীত মাটির নমুনা শীতকালজুড়ে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে। অ্যান্ড্রু জোনসের মতে, চূড়ান্ত প্রতিবেদন আগামী বছরের এপ্রিল বা মে নাগাদ পাওয়া যেতে পারে। গবেষণা অবশ্য সেখানেই শেষ হচ্ছে না; দলটি আগামী বছর এবং তার পরের বছরও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
ফলে তুরস্কের দোগুবায়াজিতের এই জাহাজসদৃশ কাঠামো নূহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ কি না তার উত্তর এখনো মেলেনি। তবে নতুন রাডার তথ্য, কোর ড্রিলিং, মাটির নমুনা ও পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ বহু পুরোনো এই রহস্যের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
সূত্র: ডেইলি সাবাহ।