রাশিয়া ও ইরানের রুবল-রিয়াল বাণিজ্যের নথি ফাঁস

রাশিয়া ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বড় অংশ রুবল ও রিয়ালে নিষ্পত্তি হচ্ছে, মস্কোর এমন দাবির সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরীণ একটি সরকারি পরিকল্পনার তথ্যের বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে। ফাঁস হওয়া ওই নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অনুমোদিত পরিকল্পনায় রাশিয়া-ইরান বাণিজ্যের মাত্র ৬৮ শতাংশ জাতীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের মধ্যে এই হার ৭১ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

ফক্স নিউজের হাতে পাওয়া ওই রুশ সরকারি পরিকল্পনার তথ্যের বরাত দিয়ে ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কোর প্রকাশ্য দাবির তুলনায় প্রকৃত চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। রাশিয়া ২০১৯ সাল থেকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে রুবল ও রিয়ালের ব্যবহার বাড়ার কথা জানিয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে এই হার ৪০, ৫০, ৬০ ও ৮০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছিলেন, দুই দেশের বাণিজ্যের ৯৫ শতাংশই রুবল ও রিয়ালে হচ্ছে।

ইরানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দাবি সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেছিলেন, ইরান ডলারকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে রুবল ও রিয়ালে বাণিজ্য করছে। তবে ফাঁস হওয়া রুশ নথিতে ২০২৪ সালের বাস্তব হার ৬৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রুবল-রিয়াল ব্যবস্থায় বড় বাধা

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা জাতীয় মুদ্রায় লেনদেনের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি করছে। রুশ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে রাশিয়ার রপ্তানি ছিল ২৭০ কোটি ডলার এবং ইরানের রপ্তানি ১৩০ কোটি ডলার।

ফলে এক পক্ষের হাতে অন্য পক্ষের মুদ্রার পর্যাপ্ত মজুত না থাকার সমস্যা দেখা দিতে পারে। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ২০২৩ সালে রিয়ালের মতো কিছু মুদ্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের মতে, এসব মুদ্রা অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে রূপান্তরযোগ্য নয়, মূল্য ওঠানামা বেশি এবং বাজারে লেনদেনের পরিমাণ এত কম যে ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সুযোগ সীমিত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানি রপ্তানিকারকদের মধ্যেও রুবল নিয়ে অনীহা রয়েছে। ইরানের একটি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সুযোগ থাকলে অনেক রপ্তানিকারক রুবল গ্রহণ করতে চান না। আর গ্রহণ করলেও দ্রুত তা দিরহামে রূপান্তর করেন।

রুবলের ঘাটতি মোকাবিলায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে প্রকাশ্যে এই ব্যবস্থার আওতায় যে অর্থের কথা জানা গেছে, তা ছিল মাত্র ১০০ কোটি রুবলের একটি আমানত। তৎকালীন হিসাবে এর মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ডলার। ওই অর্থ রুবলের সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যবহারের কথা ছিল।

রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে দুবাই-তুরস্কের ওপর নির্ভরতা

রুবল-রিয়াল ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করলে ইরানি ব্যবসায়ীদের রাশিয়ার সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধে তৃতীয় দেশের মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র ব্যবহারের প্রয়োজন কমার কথা। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে এখনো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।

ইরানের সংসদ সদস্য মেইসাম জোহুরিয়ান জুন মাসে ফার্স নিউজকে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের আগেও রাশিয়া থেকে কেনা প্রয়োজনীয় পণ্য অনেক সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে দিরহামে পরিশোধ করা হতো। আগস্টে ফার্স নিউজও প্রশ্ন তোলে, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে ব্যবসায়ীরা কেন এখনো তুরস্কের মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র ও মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করছেন।

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি জুনে মস্কো সফরকে বৈদেশিক বাণিজ্যের জটিলতা দূর করার একটি কার্যকরী উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেখানে ইরানি ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপত্র ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

জাতীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন

প্রতিবেদনটিতে রুবল-রিয়াল বাণিজ্যের পরিসংখ্যান কীভাবে হিসাব করা হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জাতীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির হার সরাসরি রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে প্রকৃত অর্থের প্রবাহকে নির্দেশ করে না। বরং কোন মুদ্রায় একটি রুশ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ বের হয়েছে, সেই ভিত্তিতে হিসাব করা হতে পারে।

অর্থাৎ কোনো রুশ আমদানিকারকের ব্যাংক হিসাব থেকে রুবল কেটে তা ডলারে রূপান্তর করে পণ্য বিক্রেতাকে ডলারে পরিশোধ করা হলেও সেটিকে রুবল নিষ্পত্তি হিসেবে গণনা করা সম্ভব। অথচ চুক্তির মূল্য নির্ধারণ ও চূড়ান্ত অর্থপ্রদান অন্য মুদ্রায় হতে পারে।

এ ছাড়া প্রচলিত সীমান্তপারের অর্থ পরিশোধের বাইরে পণ্য বিনিময় বা পণ্য ও জ্বালানি অদলবদলের ব্যবস্থাও দুই দেশ ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থ স্থানান্তরের তুলনায় পণ্য স্থানান্তর তুলনামূলক সহজ হওয়ায় এমন ব্যবস্থা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাশিয়া ২০২৩ সালে পণ্য বিনিময়ভিত্তিক বাণিজ্যের জন্য সরকারি নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে। একজন রুশ অর্থনীতিবিদের মতে, ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যে পণ্য বিনিময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।

দুই দেশ জ্বালানি অদলবদল নিয়েও কাজ করছে। ২০২২ সালের শেষ নাগাদ পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের বিনিময় শুরু হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে বছরে ৫০ লাখ টন পর্যন্ত তেল এবং ১০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের অদলবদল নিয়ে আলোচনা হয়। এ ধরনের বাণিজ্য জাতীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির প্রচলিত হিসাবের মধ্যে সবসময় নাও আসতে পারে।

প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইরানের আর্থিক ও বাণিজ্যিক সমন্বয় বাস্তব হলেও জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রকাশ্য পরিসংখ্যান এবং রুশ সরকারের অভ্যন্তরীণ নথির তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে রুবল-রিয়ালভিত্তিক লেনদেনের পাশাপাশি তৃতীয় দেশের মুদ্রা, মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র, পণ্য বিনিময় ও জ্বালানি অদলবদলের মতো একাধিক ব্যবস্থা একসঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে। সূত্র: ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি