ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে ডানপন্থী শিবিরে ভোট বিভক্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন দল পিপল অব ইসরায়েল ছয়টি আসন পেতে পারে, এমন জরিপ প্রকাশের পর ধর্মীয় জায়নবাদী দল নির্বাচনী বাধা পার হতে ব্যর্থ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে জোটের সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে ইতামার বেন-গাভির ও বেজালেল স্মোটরিচকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি তৈরি হলে অতীতের মতো এবারও ভোট নষ্ট হয়ে নির্বাচনে পুরো শিবিরের পরাজয় হতে পারে।
১৯৯২ সালের নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সে সময় ডানপন্থীরা বামপন্থীদের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েও একাধিক দলের কারণে নির্বাচনী বাধা অতিক্রম করতে না পারায় পরাজিত হয়েছিল। তাঁর দাবি, এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে ডানপন্থী জোটের ক্ষমতায় আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে।
নেতানিয়াহু স্বীকার করেন, বেন-গাভির ও স্মোটরিচের মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে। তবে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে তাঁদের এসব বিরোধ দূরে রেখে এক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুজনকে আলোচনায় বসানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার প্রকাশিত জমান ইসরায়েলের এক জরিপে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জরিপ অনুযায়ী, বেন-গাভিরের ওতজমা ইয়েহুদিত ও স্মোটরিচের ধর্মীয় জায়নবাদী দল আলাদাভাবে নির্বাচন করলে যথাক্রমে ছয়টি আসন এবং নির্বাচনী বাধা অতিক্রমের মতো প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দুটি দল একসঙ্গে লড়লে আটটি আসন পেতে পারে।
২০২২ সালের নির্বাচনে দল দুটি কারিগরি জোট করে একসঙ্গে নির্বাচন করেছিল। নির্বাচনের পর অবশ্য তারা আলাদা হয়ে যায়।
নেতানিয়াহুর ঐক্যের আহ্বানে অবশ্য সাড়া দেননি বেন-গাভির। বরং তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ওতজমা ইয়েহুদিতকে দুর্বল করে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের সঙ্গে একটি মধ্যপন্থী জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করতে চাইছেন।
বেন-গাভির বলেন, স্মোটরিচের উচিত নতুন দল পিপল অব ইসরায়েলের নেতা ওফের উইন্টারের সঙ্গে জোট করা। তাঁর দাবি, শক্তিশালী ওতজমা ইয়েহুদিতের পাশাপাশি স্মোটরিচ ও উইন্টার একসঙ্গে নির্বাচন করলেই একটি পূর্ণাঙ্গ ডানপন্থী সরকার গঠন সম্ভব।
এর জবাবে নেতানিয়াহু বেন-গাভিরকে সতর্ক করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ডানপন্থী শিবিরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। তাঁর দাবি, বিভিন্ন জরিপেই দেখা যাচ্ছে বেন-গাভির ও স্মোটরিচের কারিগরি জোট ডানপন্থীদের শক্তিশালী করতে পারে এবং ভোট নষ্ট হওয়া ঠেকাতে পারে।
নেতানিয়াহু আরও বলেন, স্মোটরিচ বর্তমানে নির্বাচনী বাধা অতিক্রমের সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছেন। তাঁরা এক না হলে আইজেনকোট, ইয়ার গোলান ও আরব দলগুলোর সমন্বয়ে একটি বামপন্থী সরকার গঠিত হতে পারে।
এদিকে নতুন দল পিপল অব ইসরায়েলের নেতা সাবেক ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা ওফের উইন্টার বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচনের পর তাঁর দল শুধু নেতানিয়াহুকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন করবে।
উইন্টার বলেন, তাঁরা ডানপন্থী শিবিরের অংশ এবং নেতানিয়াহুই সেই শিবিরের নেতা। তাই প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁর দল কেবল নেতানিয়াহুকেই সমর্থন করবে।
জমান ইসরায়েলের জরিপে উইন্টারের নতুন দল ছয়টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় ও ডানপন্থী ভোটারদের লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা এই দলের উত্থানই মূলত স্মোটরিচের দলের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
জরিপে বিরোধী নেতা আইজেনকোটের ইয়াশার ২৬ আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পেয়েছে ২২, নাফতালি বেনেটের বি-ইয়াখাদ ১৪ এবং আভিগদোর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু ১০ আসন পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। শাস জোটের নয়, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও দ্য ডেমোক্র্যাটস আটটি করে, হাদাশ-তাআল-বালাদ জোট ছয়টি এবং রা'আম পাঁচটি আসন পেতে পারে।
জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুবিরোধী জোট ৫৮টি এবং তাঁর সমর্থক জোট ৫১টি আসন পেতে পারে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১ আসন। ফলে ছোট দলগুলোর ভোট কতটা ভাগ হচ্ছে এবং কোন দল নির্বাচনী বাধা পেরোতে পারছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
৫০০ ইসরায়েলির ওপর পরিচালিত জরিপটির সম্ভাব্য ভুলের হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
উইন্টার মঙ্গলবার জেরুজালেমে পিপল অব ইসরায়েল দল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেন। দলটি কঠোর নিরাপত্তানীতি, গাজা থেকে স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন এবং হামাসের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সময় ইসরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন উইন্টার। তাঁর দলকে স্পষ্টভাবে ডানপন্থী শিবিরের অংশ হিসেবে তুলে ধরলেও দল ঘোষণার সময় তিনি নেতানিয়াহুর নাম উল্লেখ করেননি। বৃহস্পতিবারের ঘোষণায় সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকেই সমর্থনের কথা জানান তিনি।
তবে উইন্টারের রাজনৈতিক উত্থানও বিতর্কমুক্ত নয়। ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের সময় গিভাতি ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে তাঁর একটি চিঠি নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। ২০২৪ সালে পদোন্নতি না পাওয়ার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন তিনি।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ইসরায়েলের ডানপন্থী শিবিরে তাই মূল প্রশ্ন হয়ে উঠছে, ভোট ভাগাভাগি ঠেকাতে বেন-গাভির ও স্মোটরিচ এক হবেন, নাকি নতুন দলগুলোর উত্থানে ডানপন্থী ভোট আরও বিভক্ত হয়ে সরকার গঠনের সমীকরণ বদলে যাবে। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল