ইরানে পেট্রল সংকট নিয়ে বেসেন্টের দাবি ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’: ইরান

ইরানে পেট্রল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে মানুষকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে—মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের এমন দাবিকে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আজিজি বলেন, বেসেন্টের মন্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ভুল হিসাব-নিকাশের পুনরাবৃত্তি না করাই ভালো; তা না হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘ভুলে যাওয়ার মতো নয় এমন শিক্ষা’ দেবে।

আজিজি আরও লেখেন, “এটিকে শিক্ষা হিসেবে নিন এবং আপনার ভুল হিসাবের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকুন; অন্যথায় বিজয়ী সশস্ত্র বাহিনী আপনাদের এমন শিক্ষা দেবে, যা ভুলে যাওয়া কঠিন হবে।”

নিজের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি ইরান প্রেসের একটি ভিডিওও পুনরায় পোস্ট করেন। ওই ভিডিওতে দাবি করা হয়, দেশটির মানুষ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা না করে মাত্র তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যেই গাড়িতে জ্বালানি নিতে পারছেন।

এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে স্কট বেসেন্ট দাবি করেন, ইরানে পেট্রল স্টেশনগুলোতে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।

বেসেন্টের বক্তব্য ছিল, ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার পর দেশটির জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ওই শুনানিতে তিনি ইরানের অর্থনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে কথা বলছিলেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও ওই শুনানির বিষয়টি উঠে এসেছে।

আজিজির বক্তব্যের বিপরীতে, আগস্টের শেষ দিকে ইরানে পেট্রল স্টেশন ঘিরে দীর্ঘ সারি তৈরির একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

দ্য ন্যাশনাল ২৫ আগস্ট জানিয়েছিল, তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রল স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছিল এবং কিছু স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ বা সরবরাহে বিঘ্নের মুখে পড়েছিল। কেরমান ও মাশহাদেও একই ধরনের সমস্যার খবর পাওয়া যায়। ওই সময় তেহরানে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি পেট্রল বিতরণ করা হলেও অতিরিক্ত চাহিদা ও আতঙ্কজনিত মজুত প্রবণতার কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইউরোনিউজও আগস্টের শেষ সপ্তাহে ইরানে কিলোমিটারজুড়ে পেট্রল স্টেশনের সারির খবর প্রকাশ করে। দেশটির কর্মকর্তারা অবশ্য তখনও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকার দাবি করেছিলেন এবং গুজবের কারণে অপ্রয়োজনে পেট্রল স্টেশনে ভিড় না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

অর্থাৎ, ইরানে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ ও দীর্ঘ সারির ঘটনা আগে নথিভুক্ত হয়েছে, কিন্তু বেসেন্টের উল্লেখ করা নির্দিষ্ট ‘তিন থেকে চার ঘণ্টা’ অপেক্ষার দাবিটি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইরানের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যের পার্থক্য এখন বৃহত্তর অর্থনৈতিক যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন বলছে, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও যুদ্ধ পরিচালনার সামর্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা সচল রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য দিচ্ছে।

এর আগে ইরানের কর্মকর্তারাও পেট্রল সংকটের খবরকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। একই সময়ে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে তেহরানে পেট্রল বিতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছিল।

ফলে বর্তমানে ইরানে পেট্রল সংকটের বাস্তব চিত্র নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে। দীর্ঘ সারি ও সরবরাহের চাপের ঘটনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এলেও, পরিস্থিতি দেশব্যাপী কতটা গুরুতর এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে এর কতটা সৃষ্টি হয়েছে—তা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।

আজিজির সর্বশেষ বক্তব্য অবশ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্নটিও এখন ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।