ইয়েমেনের হুথি বাহিনীকে সামরিক সহায়তা ও সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বের সাতটি উন্নত অর্থনীতির দেশ নিয়ে গঠিত জোট G7। জোটটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, হুথিদের প্রতি ইরানের সহায়তা উত্তেজনা বাড়ানোর একটি বিপজ্জনক ধারার অংশ, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে G7 পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা হুথিদের ইয়েমেনে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অব্যাহত সামরিক হামলার নিন্দা জানান।
বিবৃতিতে G7 পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা হুথিদের অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বেসামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে হুমকি ও হামলা বন্ধ করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আন্তরিকভাবে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
G7 বলেছে, বেসামরিক নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিরাপত্তাকেই ঝুঁকিতে ফেলছে না, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
G7-এর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল হুথিদের প্রতি ইরানের সামরিক সহায়তা। জোটটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মনে করেন, তেহরানের এই সমর্থন ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
তবে ইরান হুথিদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাই G7-এর বিবৃতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটিকে জোটটির অবস্থান হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ইয়েমেনের সংঘাতের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তাও এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর মধ্যে মোখা বন্দর ও বাব আল-মান্দাবের প্রবেশপথে অবস্থিত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপও রয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবও হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা নিয়ে উদ্বিগ্ন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়াবে কি না, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন থেকে কোনো সামরিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
G7-এর হুথিবিরোধী কঠোর অবস্থানের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের খবরও সামনে এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ওমানে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হুথি প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে হুথিরা মার্কিন জাহাজে হামলার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ একদিকে G7 ইরান ও হুথিদের ওপর চাপ বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন সংকট নিয়ে হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ফলে সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইয়েমেনের অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের দিকে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো চলাচল করে। ফলে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে জাহাজ চলাচলের পথ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।
G7-এর বিবৃতিতে এই বিষয়টিই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জোটটির মতে, হুথিদের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং ইরানের সমর্থন আঞ্চলিক সংঘাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ তৈরি করছে।
G7-এর এই আহ্বান মূলত ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর একটি বার্তা। একই সময়ে ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে হুথিদের অগ্রগতি, সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্র-হুথি যোগাযোগ সব মিলিয়ে সংকটটি নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
এখন নজর থাকবে ইরান এই আহ্বানের কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং হুথিরা বেসামরিক জাহাজ ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আনে কি না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে ওমানে হওয়া যোগাযোগ ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগের পথ তৈরি করে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে হুথিদের সামরিক কর্মকাণ্ড, ইরানের সহায়তার মাত্রা এবং মাঠপর্যায়ের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের দাবি পরস্পরবিরোধী। ফলে এসব দাবির কিছু অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।