পাকিস্তানে এক বছরে অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার ১৫ লাখ শিশু

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৯ এএম

অনলাইনে বন্ধুত্ব, ভিডিও গেমে পরিচয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ কথোপকথন এভাবেই শুরু হচ্ছে শিশুদের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঘটনা। পাকিস্তানে এক বছরে প্রায় ১৫ লাখ শিশু অনলাইনে যৌন নিপীড়ন বা যৌন শোষণের অন্তত একটি ধরন মোকাবিলা করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের একটি নতুন গবেষণা।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের প্রায় ১৬ জনে একজন গত এক বছরে প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণাগুলোর একটি হিসেবে এটিকে উল্লেখ করেছে ইউনিসেফ।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে ১৭ বছর বয়সী এক পাকিস্তানি কিশোরীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে প্রতিবেদনে তার নাম পরিবর্তন করে ‘জারা শাহ’ বলা হয়েছে।

জারা জানান, একটি অনলাইন গেম খেলার সময় এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রথমে ওই ব্যক্তি বন্ধুর মতো আচরণ করেন। পরে দেখা করার কথা বলেন এবং একপর্যায়ে ব্যক্তিগত ও যৌন ছবি পাঠানোর জন্য চাপ দিতে থাকেন।

জারা এতে রাজি না হলে ওই ব্যক্তি তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের হুমকি দেন। পরিবারের কাছে বিষয়টি প্রকাশ পেলে স্কুলে যাওয়া কিংবা বাড়ির বাইরে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে এই আশঙ্কায় জারা কাউকে বিষয়টি জানাতে পারেননি।

তার ভাষায়, চুপ থাকাকেই তখন তুলনামূলক নিরাপদ মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পরও ভয় ও উদ্বেগ তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

ইউনিসেফের গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক একটি বিষয়। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী যেসব শিশু অনলাইনে যৌন শোষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৮৫ শতাংশ অপরাধী ছিল ভুক্তভোগীর পরিচিত।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড্যানিয়েল কার্ডেফেল্ট বলেন, এ ধরনের নির্যাতন অনেক সময় বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথন, অনলাইন গেম, উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, অর্থ কিংবা প্রেমের প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। অপরাধীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে দীর্ঘ সময় ধরে তার সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ অপরাধটি সবসময় অপরিচিত কোনো ব্যক্তির আকস্মিক যোগাযোগ দিয়ে শুরু হয় না। বরং পরিচিতি ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েও শিশুদের ধীরে ধীরে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

গবেষণায় পাকিস্তানের শিশুদের মধ্যে নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ না করার প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের প্রায় ৭১ শতাংশ এ বিষয়ে কাউকে কিছু জানায়নি। জরিপে অংশ নেওয়া কোনো শিশুই পুলিশ, হেল্পলাইন বা সমাজকর্মীর মতো আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে নির্যাতনের ঘটনা জানিয়েছে বলে পাওয়া যায়নি।

লজ্জা, সামাজিক কলঙ্ক এবং পরিবারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভয় এসব কারণেই অনেক শিশু চুপ থাকে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

লাহোরভিত্তিক শিশু অধিকার সংগঠন PAHCHAAN-এর পরিচালক মেহেক নাঈম জানান, রিপোর্ট করা নির্যাতনের প্রায় ৪৪ শতাংশ পুরোপুরি অনলাইনে সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় স্ন্যাপচ্যাট ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য।

অনলাইনে শিশুদের লক্ষ্য করে অপরাধীরা শুধু যৌন ছবি বা ভিডিও সংগ্রহেই থেমে থাকে না। শিশুদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, প্রলোভন দেখানো, যৌন কনটেন্ট তৈরিতে বাধ্য করা, ভয় দেখানো, ব্ল্যাকমেইল এবং সেই কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার মতো একাধিক ধাপ এতে যুক্ত হতে পারে।

মানবাধিকার আইনজীবী সালমান আফ্রিদি বলেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেও অপরাধীরা কাজে লাগাচ্ছে। অল্প অর্থের বিনিময়েও শিশুদের যৌন কনটেন্ট তৈরিতে প্ররোচিত করার ঘটনা রয়েছে। তার মতে, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে একটি ধারাবাহিক শোষণব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

ইউনিসেফের হিসাবে, পাকিস্তানে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে শিশুদের অনলাইন উপস্থিতি যত বাড়ছে, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তত বাড়ছে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। তবে ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের কেউ কেউ এর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের যুক্তি, নিষেধাজ্ঞা থাকলেও শিশুরা ভিপিএনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে তা এড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে শিশুদের মতপ্রকাশের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আইন আছে, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

পাকিস্তানে প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ মোকাবিলায় আইনি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আইন প্রয়োগে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যমান আইনের কিছু ফাঁকফোকরও অপরাধীদের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে তারা মনে করেন।

ইউনিসেফের গবেষণাতেও শিশুদের নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ, অভিযোগ দায়ের এবং বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধার কথা উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, আইনি কাঠামোর কিছু ঘাটতি এবং বাস্তব প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সুযোগ পেতে পারে।

অনলাইনে একটি সাধারণ কথোপকথন দিয়ে শুরু হওয়া ঘটনা কীভাবে একটি শিশুর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ভয় তৈরি করতে পারে, জারার অভিজ্ঞতা তারই উদাহরণ।

পরিবারের কাছে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয় এবং অপরাধীর হুমকি তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু নীরবতা সমস্যার সমাধান করেনি; বরং ভয় ও উদ্বেগ আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

ইউনিসেফের গবেষণার সবচেয়ে বড় বার্তা হলো শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তাকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে হবে না। একই সঙ্গে প্রয়োজন নিরাপদ রিপোর্টিং ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য সহায়ক পরিবেশ, আইন প্রয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশুদের সুরক্ষায় আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা।

পাকিস্তানের প্রায় ১৫ লাখ শিশুর অভিজ্ঞতার এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দিচ্ছে, ডিজিটাল জগতে শিশুদের নিরাপত্তা এখন কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি একই সঙ্গে সামাজিক, আইনি ও মানবাধিকার-সংক্রান্ত একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এএম
আরও পড়ুন