যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও আলোচনার টেবিলে বসার বিষয়ে ইরান নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলমান সংঘাত ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক তৎপরতার অংশ হিসেবে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির তেহরান সফরের সময় এ অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) তেহরানে পৌঁছে প্রথমে তাঁর ইরানি সমকক্ষ ইস্কান্দার মোমেনির সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নাকভি সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ডনকে জানিয়েছে, আলোচনায় ‘অগ্রগতি’ হয়েছে।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বৈঠকের বিবরণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা বা পাকিস্তানের মধ্যস্থতার বিষয়ে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে মূলত পাকিস্তান-ইরান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তেহরান কয়েকটি শর্ত সামনে রেখেছে। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই জানান, কাতারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে ইরানের শর্তগুলো পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
প্রকাশ্যে আসা শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। রেজাই বলেন, তেহরান এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোট সাতটি শর্ত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে জানানো হয়েছে। তবে সব শর্ত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার জায়গা কতটা তৈরি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ পুনরায় শুরু করার প্রচেষ্টায় পাকিস্তান গত কয়েক মাস ধরে সক্রিয় রয়েছে। এর আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক করেছেন।
আগস্টে মুনিরের তেহরান সফরের পর পাকিস্তান জানিয়েছিল, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অবসান এবং আলোচনার পথ পুনরায় চালুর বিষয়ে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তখন হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা এবং সংঘাত দ্রুত শেষ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল।
এবার নাকভির সফর সেই মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকেই নতুন করে সক্রিয় করেছে। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন বলে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
পাকিস্তানের পাশাপাশি কাতারও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের মধ্যস্থতাকারীরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে উভয় পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে আলোচনায় ফেরার সম্ভাব্য পথ খুঁজছে।
এর আগে কাতার জানিয়েছিল, তাদের কর্মকর্তারা প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং কীভাবে আবার আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে দোহা হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের ওপরও জোর দিয়েছে।
এখানে পাকিস্তান ও কাতারের ভূমিকার মধ্যে একটি পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান মূলত দুই পক্ষের রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে, আর কাতার দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের চ্যানেল হিসেবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতির সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। ইরান বলেছে, তাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আগের মতো উন্মুক্ত নৌ চলাচলে ফিরে যাওয়া কঠিন। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, হরমুজ পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করার বিষয়ে তেহরানের শর্ত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে কাতার বলছে, হরমুজের নিরাপদ ও অবাধ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার করা জরুরি। কারণ কাতার বিশ্বের অন্যতম বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিকারক এবং প্রণালির অস্থিরতা দেশটির জ্বালানি রপ্তানিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
পাকিস্তানের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে এবং হরমুজের মধ্য দিয়ে সেই জ্বালানি পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাতারের একটি এলএনজি চালান পাকিস্তানে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার খবরও এসেছে। এ ধরনের ঘটনাকে আঞ্চলিক কূটনীতির বাস্তব প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে রয়েছে আগের একটি সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের উত্তেজনা কমিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পথ তৈরি করা।
পরবর্তী সময়ে সামরিক উত্তেজনা ফের বেড়ে যাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে পাকিস্তান ও কাতার দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে নতুন করে আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।
ফলে নাকভির সর্বশেষ তেহরান সফরকে বিচ্ছিন্ন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে আগের মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাচ্ছেন। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন। ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যোগাযোগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পেজেশকিয়ান ও আরাগচিসহ ইরানের মূল প্রতিনিধিদলকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তবে তাদের চলাচলের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ ও গণমাধ্যম দলের কয়েকজন সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তবে এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের ব্যাখ্যা ও ইরানের অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
ইরানের সর্বশেষ অবস্থান থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—তেহরান কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধ বন্ধ, জব্দ অর্থ ছাড় এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের মতো শর্তকে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্ত মেনে নেবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ধরনের সংকেত দিয়েছেন। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে আবার আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হলেও সেটি কত দ্রুত এবং কোন কাঠামোর অধীনে এগোবে, তা নির্ভর করবে মূলত যুদ্ধবিরতি, হরমুজ, নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতার ওপর।
এই মুহূর্তে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতা এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন—দুটি আলাদা কূটনৈতিক চ্যানেল একই সময়ে সক্রিয় হয়েছে। ফলে সামরিক সংঘাত চলতে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনার একটি নতুন জানালা তৈরি হয়েছে। সেটি স্থায়ী আলোচনায় রূপ নেবে কি না, এখন নজর সেদিকেই।
কী বার্তা দেবেন পেজেশকিয়ান?
একই মঞ্চে ট্রাম্প, পেজেশকিয়ান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিশ্ব নেতাদের মনোযোগ থাকবে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে
নিউইয়র্কে পৌঁছেই জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে আরাগচির ফোনালাপ