যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বরের আগে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা নেই বলে তাঁর দেওয়া এই বার্তাকে ঘিরে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। একাংশের ধারণা, এটি ওয়াশিংটনের কৌশলগত চাল; অন্যদিকে কট্টরপন্থীদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আগাম আঘাত হানতে পারে তেহরান।
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা পুনরায় শুরু করার ইচ্ছা তাঁর নেই। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ চলছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের পর সপ্তাহজুড়ে ওঠানামা করা আন্তর্জাতিক তেলের দাম কমে আসে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঘিরে উদ্বেগের মধ্যেই বাজারে এই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণায় ইরানের সন্দেহ দূর হয়নি। দেশটির কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও কট্টরপন্থী ভাষ্যকার মনে করছেন, নির্বাচনের আগে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওয়াশিংটন আসলে ইরানকে আগাম আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে চাইছে।
ঘোষণাকে রাজনৈতিক কৌশল মনে করছে তেহরানের একাংশ
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান হেশমাতুল্লাহ ফালাহাতপিশেহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধের পরিকল্পনা কোনো দেশের নির্বাচনের সময়সূচির ওপর নির্ভরশীল নয়।
তাঁর যুক্তি, ৩ নভেম্বরের আগে হামলা না চালানোর ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প ইরানের সম্ভাব্য ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’ ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত সাংবাদিক পারিসা নাসরও ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ‘ট্রাম্পের কথায় কান দেবেন না: তৃতীয় যুদ্ধ আসন্ন’ শিরোনামের এক মন্তব্যে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর পর্যন্ত সামরিক হামলা স্থগিত রাখার দাবি রাজনৈতিক কৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের অংশ হতে পারে।
নাসরের মতে, ইরানের পাল্টা আঘাতের সম্ভাব্য ব্যাপ্তি ও তীব্রতা যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কট্টরপন্থী ভাষ্যকার আলিরেজা তাঘাভিনিয়াও ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের সমন্বয়কে তিনি সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে এসব বক্তব্য থেকে নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের একটি অংশের দাবি, ৩ নভেম্বরের আগে প্রায় তিন সপ্তাহের সময়কে তেহরানের কাজে লাগানো উচিত। তাঁদের মতে, সীমিত সামরিক হামলার মাধ্যমে তেলের বাজারে চাপ সৃষ্টি করা এবং ওয়াশিংটনকে ইরানের শর্তে সমঝোতায় বাধ্য করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
রাজনীতিক আবদোলরেজা দাভারি এক্সে লিখেছেন, নির্বাচনের আগে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে ট্রাম্পের উদ্বেগ তাঁর ঘোষণায় প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি ইরানের জন্য দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি করেছে।
দাভারি বলেন, ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সময়টিতে ইরানের উচিত সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করে ওয়াশিংটনকে দেশটির ‘ন্যায্য দাবি’ মেনে নিতে চাপ দেওয়া। আরেক পোস্টে তিনি আরও কঠোর ভাষায় শত্রুপক্ষের ওপর চাপ ধরে রাখার আহ্বান জানান।
তবে ইরানের অনলাইন আলোচনায় এই প্রস্তাবের বিরোধিতাও দেখা গেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, তেহরান আগে হামলা চালালে ট্রাম্প নিজেকে আক্রান্ত পক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন এবং পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে সমর্থন আদায়ের সুযোগ পাবেন।
মাহমুদ ইরানি নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যবহারকারী যুক্তি দেন, ইরানের উচিত সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখা এবং আক্রান্ত হলে পাল্টা আঘাত করা। রেজভান নামে আরেক ব্যবহারকারীর দাবি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের আগাম হামলার সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন; তেহরান আগে আঘাত হানলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাবের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
এসব বক্তব্য ইরানের জনমত বা রাষ্ট্রীয় নীতির সর্বসম্মত প্রতিফলন নয়। বরং দেশটির অভ্যন্তরে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার কৌশল নিয়ে মতপার্থক্যের চিত্র তুলে ধরে।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও হুমকি অব্যাহত রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, তেহরানের অনুমোদন ছাড়া এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাতটি শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকতে পারে।
পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির মুখপাত্র হাসান ঘাশঘাভি ট্রাম্পের তেল পরিবহন বৃদ্ধির দাবির বিরোধিতা করেছেন। রুয়দাদ ২৪-কে তিনি বলেন, বিকল্প রুট ও সীমিতসংখ্যক ট্যাংকার চলাচল হরমুজে ইরানের বিধিনিষেধের প্রভাব দূর করতে পারেনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রণালিতে উদ্যোগ এখনো ইরানের হাতেই রয়েছে।
শুক্রবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তেহরানের দাবি, জাহাজটি ‘অবৈধ রুট’ ব্যবহার করছিল।
আইআরজিসি আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, অনুমোদনহীন পথে চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুধু হরমুজ প্রণালির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; অঞ্চলটির অন্য স্থানেও তাদের শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মুখে পড়তে হতে পারে। তবে জাহাজটির পরিচয়, ক্ষয়ক্ষতি এবং ঘটনার পূর্ণ বিবরণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হলে এ বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
সরাসরি হামলা ছাড়াও চাপ তৈরির পথ
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের হুমকি ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির একটি উপায়। এর মাধ্যমে তেল ও জ্বালানি পরিবহনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা সম্ভব, যদিও এর অর্থ এই নয় যে তেহরান সরাসরি আগাম হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে, হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলার দাবি এবং সামরিক হুমকি—দুই প্রবণতা পাশাপাশি থাকায় পরিস্থিতির গতিপথ অনিশ্চিত।
ট্রাম্পের ঘোষণাকে ইরান যদি আলোচনার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে উত্তেজনা কমানোর পথ খোলা থাকতে পারে। কিন্তু ঘোষণাটিকে কৌশলগত ফাঁদ মনে করে আগাম হামলার পথে গেলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আপাতত মূল প্রশ্ন—৩ নভেম্বরের আগের সময়টি আলোচনার জন্য ব্যবহৃত হবে, নাকি পারস্পরিক সন্দেহ ও সামরিক চাপের কারণে নতুন সংঘাতের দিকে এগোবে দুই দেশ।