হঠাৎ করেই বিদেশে তৈরি সব ভোক্তা-ব্যবহারের ইন্টারনেট রাউটারকে কালোতালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতীয় নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে দেশটির ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) নতুন এক সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তৈরি কোনো নতুন কনজিউমার-গ্রেড রাউটার আর সহজে বাজারে প্রবেশ করতে পারবে না। এই সিদ্ধান্তকে সাইবার নিরাপত্তা নীতিতে একটি বড় ধরনের কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিবিসি
এফসিসি সোমবার তাদের নিরাপত্তা-ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির তালিকা হালনাগাদ করে জানায়, বিদেশে তৈরি সব ধরনের ভোক্তা রাউটার এখন থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জামের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত ইন্টারনেট সংযোগের মূল ডিভাইসগুলোর ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলো। রাউটারগুলো সাধারণত কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, স্মার্ট টিভি ও অন্যান্য ডিভাইসকে ইন্টারনেটে সংযুক্ত করার কেন্দ্রীয় মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে তৈরি যেকোনো নতুন রাউটার যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি, বিক্রি বা বাজারজাত করার আগে এফসিসির অনুমোদন নিতে হবে। এই অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলোকে তাদের মালিকানা কাঠামো, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের তথ্য এবং উৎপাদন ধাপে ধাপে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। অর্থাৎ, শুধু ডিজাইন যুক্তরাষ্ট্রে করা হলেও যদি উৎপাদন বিদেশে হয়, তবে সেই রাউটারও এই বিধিনিষেধের আওতায় পড়বে।
এফসিসি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইবার হামলার ক্ষেত্রে রাউটারের নিরাপত্তা দুর্বলতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংস্থাটির ভাষায়, “দুর্বৃত্তরা বিদেশে তৈরি রাউটারের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ, গুপ্তচরবৃত্তি, মেধাস্বত্ব চুরি এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে।” এই প্রেক্ষাপটেই রাউটারকে বিদেশি ড্রোনের মতোই সংবেদনশীল প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
নিরাপত্তা পর্যালোচনার ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, বিদেশে তৈরি রাউটারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি বড় আকারের সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সাম্প্রতিক একাধিক সাইবার হামলার উদাহরণ টেনে এফসিসি জানিয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ‘ভোল্ট, ফ্ল্যাক্স এবং সল্ট টাইফুন’ নামের তিনটি বড় সাইবার অভিযানে রাউটারের দুর্বলতা ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব ঘটনায় চীনা সরকারের সঙ্গে যুক্ত বা তাদের হয়ে কাজ করা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলে চীনসহ বিভিন্ন দেশের রাউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন চাপে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে বড় অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ আরও কঠিন হয়ে যাবে। চীনের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড টিপি-লিংক, যা অ্যামাজনে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া রাউটারগুলোর একটি, আগেও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল।
তবে এফসিসি বলছে, নতুন এই নিষেধাজ্ঞা বর্তমান ব্যবহারকারীদের জন্য নয়। অর্থাৎ যেসব বিদেশি রাউটার ইতোমধ্যে বাজারে রয়েছে বা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যাবে। নিষেধাজ্ঞা কেবল ভবিষ্যতে আসা নতুন মডেলগুলোর ওপর প্রযোজ্য হবে।
বিশ্বব্যাপী রাউটার উৎপাদনের বড় অংশই এখন তাইওয়ান ও চীনে হয়ে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় কিছু ব্র্যান্ড যেমন নেটগিয়ার, একটি মার্কিন কোম্পানি হলেও তাদের উৎপাদন বিদেশেই হয়। ফলে নতুন নিয়মের কারণে এসব কোম্পানিকেও উৎপাদন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে।
তবে ব্যতিক্রম হিসেবে স্টারলিংকের ওয়াইফাই রাউটার উল্লেখ করা হচ্ছে, যা স্পেসএক্সের অংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে তৈরি হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রযুক্তি-নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতা, যেখানে হুয়াওয়ে বা ডিজেআইয়ের মতো চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপরও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। এবার সেই নীতির পরিধি আরও বিস্তৃত করে সাধারণ ভোক্তা ইন্টারনেট ডিভাইস পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হলো।
সব মিলিয়ে নতুন এই সিদ্ধান্ত শুধু নিরাপত্তা নীতির পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।