শি জিনপিংকে রাজার মতো অভ্যর্থনা দিয়ে কী চান ট্রাম্প

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অভূতপূর্ব জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে নিজে উপস্থিত হয়ে শি ও তাঁর স্ত্রী পেং লিইউয়ানকে স্বাগত জানান ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। লালগালিচা, সামরিক সম্মান, বিমানবাহিনীর প্রদর্শনী এবং হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, সব মিলিয়ে সফরটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই অভ্যর্থনা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, এর পেছনে বড় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। কারণ বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান, বিরল খনিজ এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো নানা ইস্যুতে উত্তেজনাপূর্ণ। এবারের বৈঠকে সেই সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করার পাশাপাশি একাধিক বিষয়ে চীনের কাছ থেকে ছাড় বা সহযোগিতা আদায় করতে চাইছে ওয়াশিংটন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কয়েক দফা শুল্কবিরোধের পর বর্তমানে একটি বাণিজ্য-সমঝোতা বা ‘ট্রেড ট্রুস’ কার্যকর রয়েছে। দুই দেশ সেটি আরও কিছু সময় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করছে। মার্কিন প্রশাসন একই সঙ্গে চীনা বাজারে মার্কিন পণ্য, বিশেষ করে কৃষিপণ্য কেনা বাড়াতে আগ্রহী।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প সম্ভাব্যভাবে চীনের কাছ থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ ও মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার মতো বড় অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি চাইতে পারেন। অর্থাৎ শি-কে দেওয়া জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনার একটি লক্ষ্য হতে পারে আলোচনার পরিবেশকে সংঘাতের বদলে চুক্তিমুখী রাখা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিরল খনিজ। আধুনিক ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন পণ্যে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ। চীন এসব খনিজের প্রক্রিয়াজাতকরণে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

ওয়াশিংটন চাইছে চীন যেন মার্কিন ক্রেতাদের কাছে বিরল খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ ধারাবাহিক রাখে। মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আগের কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের কার্যক্রম প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। এখানে ট্রাম্পের জন্য বিষয়টি শুধু বাণিজ্য নয়; প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গেও এটি যুক্ত।

বর্তমান বৈঠকের সবচেয়ে জটিল ভূরাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় চাপ তৈরি করেছে। চীন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং ইরানি তেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প বেইজিংয়ের কাছ থেকে ইরান ইস্যুতে কী ধরনের সহযোগিতা চান, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বিষয়ে ওয়াশিংটনের চাপ এবং চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হতে পারে। অর্থাৎ ট্রাম্পের জন্য শি-র সঙ্গে বৈঠক শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বৈঠক নয়; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি দীর্ঘদিনের দাবি হলো ফেন্টানিল তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের সরবরাহ বন্ধ করা। বৈঠকের ঠিক আগে চীন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে রপ্তানির ক্ষেত্রে আরও দুটি মাদক-উৎপাদনকারী রাসায়নিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। নতুন দুটি রাসায়নিক যুক্ত হওয়ায় নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের সংখ্যা ১৮-তে দাঁড়িয়েছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে।

ওয়াশিংটন চায় চীন এই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করুক এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ফেন্টানিল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সরবরাহ কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিক। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে বাণিজ্যিক দরকষাকষির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।

ট্রাম্পের আরেকটি সম্ভাব্য দাবি হলো চীনে আটক কিছু মার্কিন নাগরিকের মুক্তি। সাম্প্রতিক আলোচনায় মার্কিন প্রশাসন এ ধরনের কয়েকটি মামলার বিষয়ে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বৈঠকে কিছু মার্কিন নাগরিক এবং অন্য আটক ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয় তুলতে পারেন।

এটি ট্রাম্পের জন্য অভ্যন্তরীণভাবেও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু, কারণ বিদেশে আটক মার্কিন নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি মার্কিন রাজনীতিতে সাধারণত উচ্চমাত্রার গুরুত্ব পায়।

বাণিজ্য ও অর্থনীতির বাইরে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো তাইওয়ান। চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এক চীন’ নীতি বজায় রাখলেও তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে।

এবারের বৈঠকে বেইজিং তাইওয়ান প্রসঙ্গ তুলতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য বড় ধরনের অস্ত্র বিক্রির বিষয় নিয়েও সিদ্ধান্তের মুখোমুখি।

তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো বড় সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। বরং এটি দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইও বৈঠকের আলোচনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রতিযোগিতা করছে এবং এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করছে। দুই দেশ এআই-সংক্রান্ত গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিলে একে অপরকে অবহিত করার মতো যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছে।

তবে এআই ক্ষেত্রে সহযোগিতা হলেও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ওয়াশিংটন উন্নত প্রযুক্তিতে নিজের অগ্রাধিকার ধরে রাখতে চায়, আর বেইজিংও এআই সক্ষমতা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে।

শিকে বিমানবন্দরে নিজে গিয়ে স্বাগত জানানোর ঘটনাটি প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ক্ষেত্রে খুবই বিরল বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক বার্তা হলো, দুই দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও ওয়াশিংটন সম্পর্ককে সম্পূর্ণ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে চায় না।

তবে এই আড়ম্বরপূর্ণ অভ্যর্থনা থেকে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি নিশ্চিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। বরং বৈঠকের মূল পরীক্ষা হবে, দুই নেতা বাস্তবে বাণিজ্য, বিরল খনিজ, মাদক নিয়ন্ত্রণ, ইরান, তাইওয়ান ও প্রযুক্তি ইস্যুতে কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন।

শি জিনপিংকে ‘রাজার মতো’ অভ্যর্থনা দেওয়ার দৃশ্যটি তাই একদিকে কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রতীক, অন্যদিকে বাস্তব দরকষাকষির পরিবেশ তৈরির অংশ।

ট্রাম্পের প্রত্যাশিত বিষয়গুলোকে মোটামুটি চারটি স্তরে ভাগ করা যায়, অর্থনৈতিক সুবিধা, সরবরাহ-শৃঙ্খলের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সহযোগিতা।

চীনের দিক থেকেও পাল্টা স্বার্থ রয়েছে। বেইজিং মার্কিন প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে, বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং তাইওয়ানসহ কৌশলগত প্রশ্নে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে চাইবে। রয়টার্স জানিয়েছে, চীন উন্নত মার্কিন প্রযুক্তিতে প্রবেশের ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ে আগ্রহী, অন্যদিকে ওয়াশিংটন বিরল খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে।

ফলে এবারের ট্রাম্প-শি বৈঠকের মূল প্রশ্ন কেবল কে কাকে কী দিলেন, তা নয়। বরং দুই পরাশক্তি কীভাবে প্রতিযোগিতা বজায় রেখেও সংঘাতের ঝুঁকি কমিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে যেতে পারে, সেটিই হবে বৈঠকের বড় পরীক্ষা।