চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে একটি বিশালাকার ব্যাল্ড ঈগলের ভাস্কর্য উপহার দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে শির সম্মানে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে এই উপহার দেওয়া হয়।
উত্তর আমেরিকার স্থানীয় পাখি ব্যাল্ড ঈগল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক। ট্রাম্পের দেওয়া ভাস্কর্যটিও তাই নিছক একটি উপহার নয়; কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এর মধ্যে প্রতীকী বার্তাও রয়েছে। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ভাস্কর্যটি ‘আমেরিকার স্বাধীন ও উড্ডীয়মান চেতনা’র প্রতীক। তিনি জানান, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ও তিনি ব্যক্তিগতভাবে শিল্পীর সঙ্গে এর নকশায় যুক্ত ছিলেন।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উপহার বিনিময় আন্তর্জাতিক কূটনীতির পুরোনো একটি রীতি। অনেক সময় একটি উপহার দুই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতীয় পরিচয় বা সম্পর্কের প্রতীকী বার্তা বহন করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দুই পরাশক্তির নেতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শি ও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্কও দুই দেশের জটিল সম্পর্ক পরিচালনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি নিয়ে বিরোধ থাকলেও নেতাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ট্রাম্পের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রতীকী আয়োজনের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি এর আগেও দেখা গেছে। শির এবারের সফরের শুরুতেও ট্রাম্প বিমানবন্দরে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান—যা মার্কিন প্রেসিডেন্টদের প্রচলিত প্রটোকলের তুলনায় ব্যতিক্রমী ছিল।
শি জিনপিংও সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে প্রতীকী কিছু ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আটলান্টার একটি চিড়িয়াখানায় দুটি জায়ান্ট পান্ডা পাঠানোর কথা জানান। চীনা প্রেসিডেন্ট পান্ডাকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের দূত হিসেবে তুলে ধরেন।
এ ছাড়া পাঁচ বছরে ১ লাখ মার্কিন শিক্ষার্থীকে চীনে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার একটি নতুন শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচির ঘোষণাও দেন তিনি।
অর্থাৎ, ট্রাম্পের ঈগল এবং শির পান্ডা—দুটি উপহারের মধ্যেই দুই দেশের জাতীয় পরিচিতি ও বন্ধুত্বের প্রতীকী উপাদান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উপহার অনেক সময় সম্পর্কের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কোনো নেতা অন্য দেশের নেতাকে এমন কিছু উপহার দিতে পারেন, যার মাধ্যমে নিজের দেশের মূল্যবোধ, ইতিহাস বা সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছ থেকে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রেও অবশ্য নানা নিয়ম রয়েছে। বিদেশি সরকারের দেওয়া উপহারের মূল্য নির্দিষ্ট সীমা ছাড়ালে তা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে রাখার সুযোগ থাকে না এবং মার্কিন সরকারের নিয়ম অনুযায়ী তা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত হতে পারে।
কূটনীতির বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপহার বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও অনেক প্রস্তুতি ও আলোচনা থাকে। কী দেওয়া হবে, কোথায় বিনিময় হবে এবং কীভাবে সেটি উপস্থাপন করা হবে—সবকিছুই সাধারণত প্রটোকল ও আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
আগেও শিকে প্রতীকী উপহার দিয়েছিলেন ওবামা
শি জিনপিংয়ের ২০১৩ সালের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তাঁকে একটি বিশেষ উপহার দিয়েছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় রেডউড কাঠ দিয়ে তৈরি একটি বেঞ্চে বিশেষ খোদাই করা হয়েছিল। পরে ওবামা ও শি ওই বেঞ্চে বসে ছবি তোলেন।
এর বিপরীতে ২০০৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপহার বিনিময় নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিকর আলোচনা হয়েছিল। ব্রাউন ওবামাকে একটি ঐতিহাসিক জাহাজের কাঠ দিয়ে তৈরি অলংকারমূলক কলমদানি উপহার দিয়েছিলেন। ওবামার দেওয়া ডিভিডিগুলো আবার যুক্তরাজ্যের ডিভিডি প্লেয়ারে চালানো যাচ্ছিল না বলে সে সময় খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
ব্যাল্ড ঈগল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে শিকে এই পাখির ভাস্কর্য দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক, স্বাধীনতার ধারণা এবং দুই নেতার ব্যক্তিগত কূটনৈতিক সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয়কে সামনে এনেছেন বলে বোঝা যায়।
তবে উপহারের প্রতীকী অর্থকে দুই দেশের নীতিগত মতপার্থক্যের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না। শি ও ট্রাম্পের বৈঠকের আলোচনায় বাণিজ্য, বিরল খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ানসহ একাধিক জটিল ইস্যু রয়েছে। সাম্প্রতিক বৈঠকেও এসব বিষয়ে বড় কোনো অগ্রগতির স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি।
তাই রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের জাঁকজমক, সামরিক আনুষ্ঠানিকতা কিংবা ঈগলের ভাস্কর্যের মতো প্রতীকী আয়োজনের পাশাপাশি বাস্তব কূটনীতির মূল পরীক্ষা হবে—ওয়াশিংটন ও বেইজিং তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো কীভাবে সামলায় এবং দুই দেশের সম্পর্ককে কতটা স্থিতিশীল রাখতে পারে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ঈগল ‘আমেরিকার স্বাধীন ও উড্ডীয়মান চেতনা’র প্রতীক। আর কূটনীতির ভাষায়, এই উপহার সম্ভবত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির সম্পর্কের মধ্যে প্রতীকী সৌহার্দ্যের একটি বার্তা—যার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে আলোচনার টেবিলে নেওয়া সিদ্ধান্তে।