ম্যাক্রোঁর সিরিয়া সফরের সময় দামেস্কে বিস্ফোরণ নিয়ে যা জানা গেলো

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঐতিহাসিক সিরিয়া সফরের সময় দেশটির রাজধানী দামেস্কে দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট যে হোটেলে অবস্থান করেছিলেন বলে জানা গেছে, তার কাছেই বিস্ফোরণগুলো ঘটে। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বৈঠকের জন্য রওনা হন। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এটি ম্যাক্রোঁ ও তার প্রতিনিধিদলকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার চেষ্টা হতে পারে।

২০২৪ সালে বিদ্রোহী বাহিনীর অভিযানে বাশার আল-আসাদের পতনের পর ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের এটি প্রথম সিরিয়া সফর। সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বাহিনী ওই অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আসাদ শাসনের অবসান ঘটায়।

দামেস্কের শহরকেন্দ্রের ব্যস্ত এলাকায় দুটি বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার দামেস্ক প্রতিনিধি ওবাইদা হিত্তো। এলাকাটি পর্যটন মন্ত্রণালয় ও ফোর সিজনস হোটেলের কাছে, যেখানে ম্যাক্রোঁ আগের রাতে অবস্থান করেছিলেন।

সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা জানিয়েছে, বিস্ফোরণে ১৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে চারজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। পরে মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় জানায়, নিরাপত্তা বাহিনী বিস্ফোরক ডিভাইস শনাক্ত করার পর তা নিষ্ক্রিয় করার জন্য বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছিল। তবে ডিভাইসগুলো বিস্ফোরিত হয়ে যায়। হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ওই এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাক্রোঁর গাড়িবহর হোটেল ছেড়ে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দিকে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর একটি আবর্জনার বিনে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। রয়টার্সের ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বিন থেকে আগুন ও ধোঁয়া বের হচ্ছে। এর কয়েক গজ দূরে দ্বিতীয় বিস্ফোরণের ঘটনাও ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

ফোর সিজনস হোটেলের কাছে একটি অ্যাম্বুলেন্সের পাশে দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে। ওই সময় আশপাশে প্রায় দুই ডজন মানুষ অবস্থান করছিলেন। টেলিভিশন ফুটেজে শহরের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। আল জাজিরার যাচাই করা অনলাইন ভিডিওতে একটি গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আল জাজিরাকে বলেছেন, ম্যাক্রোঁর গাড়িবহর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের পথে যাওয়ার সময় বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য আগেই বিস্ফোরক ডিভাইস স্থাপন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিস্ফোরণগুলো ম্যাক্রোঁর নির্ধারিত নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে ঘটেছে এবং তাঁর অবস্থান বা সফরসূচির জন্য সরাসরি কোনো হুমকি তৈরি করেনি।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, ম্যাক্রোঁ বিস্ফোরণের শব্দও শুনতে পাননি। তিনি নিরাপদে আল-শারার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। আল জাজিরার প্রতিবেদক হিত্তো প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হলেও সেখানে পরিস্থিতি শান্ত ছিল।

এখন পর্যন্ত বিস্ফোরণের দায় কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। হামলার উদ্দেশ্য ও হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ফরাসি প্রতিনিধিদলই সম্ভাব্য লক্ষ্য ছিল।

সিরিয়ার ইদলিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক গবেষক কামাল আবদেও বলেন, ঘটনাটি ম্যাক্রোঁকে লক্ষ্য করেই ঘটানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তাঁর মতে, ম্যাক্রোঁর গাড়িবহরের সম্ভাব্য পথগুলোতে রাতের বেলায় অস্থায়ী বিস্ফোরক ডিভাইস স্থাপন করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, “ম্যাক্রোঁ পৌঁছানোর পর রাতে এগুলো স্থাপন করা হয়ে থাকতে পারে।” তিনি ঘটনাটিকে “বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, সিরিয়া সরকারকে বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে।

সিরিয়ার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইসমত আল-আবসি বলেন, হামলার উদ্দেশ্য সম্ভবত ছিল “অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং নেতিবাচক বার্তা দেওয়া”। তিনি আরও বলেন, “তবে বিষয়টি পরিষ্কার—এখানে নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে, এবং তা সমাধান করতে হবে, যাতে সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি না হয়।”

মঙ্গলবারের বিস্ফোরণের আগে গত বৃহস্পতিবার দামেস্কের বিচার প্রাসাদের কাছে একটি ক্যাফেতে বিস্ফোরক হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হন।

আসাদ সরকারের পতনের পর কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ম্যাক্রোঁর এই দামেস্ক সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সিরিয়ার পুনর্গঠন এই সফরের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, ম্যাক্রোঁর সঙ্গে কয়েকজন ফরাসি ব্যবসায়ী নেতাও সিরিয়া সফরে রয়েছেন।

বিস্ফোরণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ম্যাক্রোঁ বলেন, “সিরিয়ার জনগণের একটি সম্পূর্ণ সার্বভৌম, নিরাপদ, বহুত্ববাদী ও ঐক্যবদ্ধ সিরিয়ায় বসবাসের আকাঙ্ক্ষাকে কোনো কিছু দমন করতে পারবে না।”

তিনি আরও বলেন, সকালে তিনি বিভিন্ন শ্রেণির সিরীয় নাগরিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যাঁরা “মর্যাদা, সাহস ও দৃঢ় সংকল্প” প্রদর্শন করেছেন। ম্যাক্রোঁ বলেন, “আমার সফর অব্যাহত রয়েছে।”

সিরিয়ার নতুন সরকার এই সফরকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। আল-শারা একসময় আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছেন, যারা আসাদ সরকারের সময় সিরিয়াকে এড়িয়ে চলত।

আল জাজিরার প্রতিবেদক হিত্তো বলেন, “সিরিয়া সরকার এই সফরকে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে একটি দরজা হিসেবে তুলে ধরছে।”

মঙ্গলবার আল-শারার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ বলেন, সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠন, বিশেষ করে দেশটির ব্যাংকিং খাত পুনরুজ্জীবনে ফ্রান্স ভূমিকা রাখতে চায়। আল-শারা বলেন, তিনি ফ্রান্সকে দামেস্কের “প্রধান অংশীদার” হিসেবে দেখতে চান। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক বিঘ্নের পর বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থায় সিরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

দুই দেশের সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান চলাচল ও জ্বালানি খাত। ম্যাক্রোঁর কার্যালয় জানিয়েছে, ফরাসি নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান সিএমএ সিজিএম সিরিয়ার সঙ্গে একটি অংশীদারত্ব চুক্তি করেছে। এর আওতায় দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানপণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আগে মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি সিরিয়ায় দুটি ড্রাই পোর্ট পরিচালনার জন্যও চুক্তি করেছিল।

ফ্রান্স ও সিরিয়া ৫ কোটি ১০ লাখ ইউরো (প্রায় ৫ কোটি ৮৩ লাখ ডলার) সিরিয়ায় ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলেও জানিয়েছে ম্যাক্রোঁর কার্যালয়। এসব অর্থ আসাদের চাচা রিফাত আল-আসাদের সম্পদ, যা অর্থপাচার ও সিরিয়ার সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ফ্রান্স জব্দ করেছিল।

ফরাসি তেল কোম্পানি টোটালএনার্জিসের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক পুয়ানে জানিয়েছেন, সিরিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে জ্বালানি অনুসন্ধান চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনিও মঙ্গলবার বৈঠক করছেন। পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে আরও কিছু চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার প্রতিবেদক হিত্তো।

সূত্র: আলজাজিরা