পাকিস্তানে ড্রোন হামলা ঠেকাতে মাছ ধরার জাল!

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন হামলা ঠেকাতে নিরাপত্তা চৌকিগুলোর ওপর মাছ ধরার জাল টাঙাচ্ছে পুলিশ। কম খরচে তৈরি এই জাল কয়েক মিটার ওপর থেকে চৌকির ছাদ ও চারপাশের দেয়ালের মধ্যে টানিয়ে এক ধরনের আকাশঢাকা প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। হামলা ঠেকানোর পাশাপাশি বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি কমাতেও এটি কাজে আসবে বলে আশা করছে পুলিশ।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার হাঙ্গু জেলায় এ ব্যবস্থা প্রথম চালু করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল সারকি পিয়ালা পুলিশ চৌকিতে ড্রোন থেকে বিস্ফোরক হামলা চালায় পাকিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান। হামলার পর সশস্ত্র সদস্যরা চৌকিটি চারদিক থেকে ঘিরে গুলি চালায়। প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলা ওই সংঘর্ষে একটি সাঁজোয়া যানের চালক নিহত এবং এক পুলিশ সদস্য আহত হন।

হাঙ্গু জেলা আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। হাঙ্গুর পুলিশ কর্মকর্তা ফাইয়াজ খান বলেন, ওই হামলার সময় পুলিশ সদস্যরা ব্যাপক আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। তারা জানতেন না, শেষ পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না।

এ ধরনের হামলা মোকাবিলায় স্থানীয় পুলিশ প্রায় দুই মাস আগে সারকি পিয়ালা চৌকির ওপর মাছ ধরার জাল টাঙানো শুরু করে। কালো জালের কাঠামো দড়ি ও তারের সাহায্যে চৌকির ওপর কয়েক মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা ফাইয়াজ খানের মতে, কোনো ড্রোন চৌকির ওপর দিয়ে উড়ে এলে জালে আটকে যেতে পারে, এতে সেটিকে নিষ্ক্রিয় করা বা থামানো সম্ভব হতে পারে।

জালের ওপর ড্রোন বিস্ফোরিত হলেও ক্ষয়ক্ষতি কম হতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। তাদের মতে, বিস্ফোরণের টুকরো ও ধ্বংসাবশেষ সরাসরি নিচে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর পড়ার পরিবর্তে বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

হাঙ্গুর জেলা পুলিশ কর্মকর্তা তারিক হাবিব জানান, একটি সাধারণ পুলিশ চৌকি মাছ ধরার জাল দিয়ে ঢাকতে প্রায় ৪ লাখ পাকিস্তানি রুপি খরচ হয়। ঝুঁকিপূর্ণ পুলিশ স্টেশন ও চৌকিগুলোতে ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার হামলার প্রভাব কমাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলায় আরও কয়েকটি পুলিশ স্টেশনে জাল স্থাপনের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

প্রদেশটির পুলিশ জানিয়েছে, হাঙ্গু ছাড়াও কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খান, অন্তত আরও পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় পুলিশ চৌকি ও নিরাপত্তা পোস্টে এ ধরনের জাল স্থাপন করা হয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার কয়েকটি এলাকায় সামরিক পোস্টেও ড্রোনবিরোধী এই জাল ব্যবহার করা হচ্ছে।

পুলিশের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার কৌশলে পরিবর্তন। আগে গুলিবর্ষণ ও মর্টার হামলার পাশাপাশি এখন ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে বিস্ফোরক হামলাও চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা বেড়েছে। এসব হামলার অনেকগুলোর দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান।

হাঙ্গুতে গত ২৯ জুলাই আরও ভয়াবহ একটি হামলায় বোমা বহনকারী কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে একটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালানোর পর স্থলপথে অতর্কিত আক্রমণ করা হয়। ওই ঘটনায় অন্তত ১১ পুলিশ সদস্য নিহত এবং ২৮ জন আহত হন। কয়েক ঘণ্টার ওই হামলায় ১৫ হামলাকারীও নিহত হয় বলে জানায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ।

এরপর ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে আরেকটি সংঘর্ষে ছয় সেনা ও আট হামলাকারী নিহত হওয়ার কথা জানায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এর দুই দিন আগে খাইবার পাখতুনখাওয়ার কোহাট জেলায় ইতেহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বিত হামলায় ২৩ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১৬ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন। ওই হামলায় একটি মসজিদেও বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

হাঙ্গু পুলিশের ভাষ্য, চলতি বছর জেলায় অন্তত ১৬টি সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে মাছ ধরার জাল স্থাপনের পর সারকি পিয়ালা ও কাছের বালিয়ামেনা চৌকিতে আর কোনো ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার হামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা জিশান খান। তার মতে, জাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত স্তর হিসেবে কাজ করছে এবং হামলা হলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইসলামাবাদভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুলের মতে, নির্দিষ্ট স্থানে জাল টাঙানো নিরাপত্তার একটি ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। তার বক্তব্য, পুলিশ স্টেশনই সবসময় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্য নয়; গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করেও ড্রোন হামলা চালানো হতে পারে।

পেশোয়ারভিত্তিক সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফিদা আদিলও জালের কার্যকারিতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোনের বিরুদ্ধে মাছ ধরার জাল কতটা কার্যকর হবে, তা জালের নকশা ও স্থাপনের ওপর নির্ভর করে। পুলিশ যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সুরক্ষার হিসাব দিয়েছে, বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে তা যাচাই করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে খাইবার পাখতুনখাওয়া পুলিশের মুখপাত্র আবদুস সালাম খালিদ জানিয়েছেন, কোহাটে জাল ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পরীক্ষার সময় একটি জালের ওপর বিস্ফোরক ফেলা হলেও সেটি বিস্ফোরিত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

হাঙ্গুর পুলিশ কর্মকর্তা ফাইয়াজ খানও স্বীকার করেছেন, মাছ ধরার জাল কোনো পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়। তবে তার ও সহকর্মীদের জন্য এটি কিছুটা বাড়তি নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করছে। তিনি বলেন, জাল পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারে না, তাই পুলিশ সদস্যরা হামলার জন্য প্রস্তুত থাকেন এবং দায়িত্ব পালনে কোনোভাবেই পিছিয়ে যাবেন না। সূত্র: আলজাজিরা