আজকের দিনে ঢাকায় 'ভুখা মিছিল' কেন হয়েছিলো?

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৬ এএম

হাতে খালি থালা, হাঁড়ি-পাতিল ও কণ্ঠে ভাতের দাবি। খাদ্যসংকট আর নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বিপর্যস্ত মানুষের সেই প্রতিবাদে ১৯৫৬ সালের ২৯ আগস্ট উত্তাল হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাজপথ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক ‘ভুখা মিছিল’ বা ‘হাঙ্গার মার্চ’ শুধু খাদ্যের দাবিতে একটি প্রতিবাদ ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল তৎকালীন শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ।

পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ভুখা মিছিল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। খাদ্যসংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ জমে উঠেছিল, ২৯ আগস্টের মিছিল ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ।

পটভূমি: খাদ্যসংকট ও মানুষের দুর্ভোগ

১৯৫৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়। খাদ্যের সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি এবং বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে পূর্ব বাংলায় খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অর্থ বরাদ্দের দাবিতে আন্দোলনে নামেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী। খাদ্য পরিস্থিতির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং মন্ত্রিসভার ব্যর্থতার প্রতিবাদে তিনি জনআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

এর আগে ১৯৫৬ সালের মে মাসে ঢাকায় খাদ্যসংকটের প্রতিবাদে তিনি আমরণ অনশনও শুরু করেছিলেন।

২৯ আগস্ট: ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হলো মিছিল 

জনসমাবেশ ও মিছিল ঠেকাতে তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হলেও আন্দোলনকারীরা সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেন।

১৯৫৬ সালের ২৯ আগস্ট মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে হাজারো মানুষ ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন। মিছিলকারীদের হাতে ছিল খালি থালা, হাঁড়ি ও অন্যান্য গৃহস্থালি সামগ্রী। এসব প্রতীকী উপকরণের মাধ্যমে তাঁরা খাদ্যসংকট ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিবাদ জানান।

খাদ্যের দাবিতে সাধারণ মানুষের এই মিছিল পরবর্তী সময়ে ‘ভুখা মিছিল’ নামে পরিচিতি পায় এবং পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় গণআন্দোলন হিসেবে স্থান করে নেয়।

আন্দোলনের প্রভাব ও রাজনৈতিক সংকট

ভুখা মিছিলের সময় পূর্ব পাকিস্তানে আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা ক্ষমতায় ছিল। খাদ্যসংকট ও জনদুর্ভোগ নিয়ে আগে থেকেই সরকারের ওপর চাপ বাড়ছিল। ভুখা মিছিল সেই রাজনৈতিক চাপকে আরও তীব্র করে তোলে।

গণঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ১৯৫৬ সালের ৩০ আগস্ট আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। এর পরের মাসে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে নতুন সরকার গঠিত হয়।

ভুখা মিছিল তাই শুধু একটি দিনের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।

ভাতের দাবির সঙ্গে অধিকার

১৯৫৬ সালের ভুখা মিছিলের তাৎপর্য ছিল আরও বিস্তৃত। এই আন্দোলন দেখিয়েছিল, মানুষের রাজনৈতিক অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাদ্য, জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও গণআন্দোলনের বড় ভিত্তি হতে পারে।

খাদ্যের দাবিতে সাধারণ মানুষের রাজপথে নেমে আসা তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে জনসম্পৃক্ত আন্দোলনের শক্তিকেও সামনে নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের বিভিন্ন আন্দোলনে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজ থেকে সাত দশক আগে ঢাকার রাজপথে খালি থালা হাতে মানুষের সেই মিছিল তাই শুধু ক্ষুধার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, বরং অধিকার আদায়ে সাধারণ মানুষের সংগঠিত হওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মারক।

১৯৫৬ সালের ২৯ আগস্টের ‘ভুখা মিছিল’ আজও মনে করিয়ে দেয় মানুষের মৌলিক চাহিদা ও জীবনযাত্রার সংকট যখন উপেক্ষিত হয়, তখন সেই ক্ষোভ একসময় রাজপথে গিয়েও প্রকাশ পেতে পারে।

এএম
আরও পড়ুন