শত বছরের ঐতিহ্যে বেলুয়া নদীর ভাসমান হাট

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই বেলুয়া নদীর বুকজুড়ে ভেসে ওঠে সারি সারি নৌকা। কোনো নৌকায় মিষ্টিকুমড়া, কোনোটি বোঝাই লাউ, পটোল, করলা, ঝিঙে কিংবা কচু। কোথাও নারিকেল-কলার স্তূপ, আবার কোথাও দেখা যায় বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়। সড়কের বাজার নয়, এখানে নৌকাই দোকান, নৌকাই আড়ত আর নদীর বুকই যেন পুরো বাজারের জায়গা। পিরোজপুরের নাজিরপুরের বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন বেলুয়া নদীতে সপ্তাহের দুই দিন এভাবেই বসে দেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী ভাসমান কৃষিপণ্যের হাট।

শনিবার ও মঙ্গলবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এ হাটে নাজিরপুর, নেছারাবাদ ও বানারীপাড়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা নৌকায় করে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসেন। ভোরের সঙ্গে সঙ্গে নদীতে বাড়তে থাকে নৌকার সংখ্যা। কৃষকদের কাছ থেকে সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য কিনতে জড়ো হন পাইকার, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ছোট বিক্রেতারা। কৃষকের নৌকা থেকে সরাসরি পণ্য চলে যায় বড় নৌকা, ট্রলার কিংবা স্থলপথের যানবাহনে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বেলুয়া নদী ও বৈঠাকাটা বাজার ঘিরে এই কৃষিপণ্যের কেনাবেচার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। ঠিক কত বছর ধরে ভাসমান হাটটি চলছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সবাই একমত দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিপণ্য বেচাকেনায় বৈঠাকাটা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

নৌকায় শুরু, এখন বড় পাইকারি কেন্দ্র

একসময় এ অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ ছিল সীমিত। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় একশ বছর আগে থেকেই কৃষকরা নৌকায় করে বেলুয়া নদীতে এসে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতেন। ক্রেতারাও নৌকায় নৌকায় ঘুরে পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। ধীরে ধীরে এই বেচাকেনাকে ঘিরে গড়ে ওঠে বড় বাজার।

স্থানীয় প্রবীণ আবদুল গফুর মিয়া বলেন, তখন সড়কপথে যোগাযোগের সুযোগ খুব কম ছিল। নদীপথই ছিল মানুষের চলাচল ও পণ্য পরিবহনের প্রধান অবলম্বন। কৃষকেরা নৌকায় করে সবজি নিয়ে আসতেন, আর স্থানীয় ক্রেতারা নৌকা থেকেই তা কিনতেন। সময়ের সঙ্গে বাজারের পরিধি বাড়তে থাকে। দূরদূরান্তের পাইকাররাও এখন বড় নৌযান ও ট্রলার নিয়ে এখানে আসেন।

স্থানীয় প্রবীণদের কেউ কেউ জানান, বৈঠাকাটা বাজারটি ১৯৫৪ সালে বেলুয়া নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ভাসমান হাটের সূচনাকাল নিয়ে নির্দিষ্ট লিখিত তথ্য না থাকায় এর বয়স নিয়ে নিশ্চিতভাবে কোনো একটি সময়কাল উল্লেখ করতে চান না তারা।

ভোরেই জমে ওঠে নদীর বাজার

১৮ সেপ্টেম্বর সকাল সোয়া ৬টার দিকে বেলুয়া নদীতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নৌকায় নৌকায় চলছে বেচাকেনা। কোনো নৌকায় কৃষক অপেক্ষা করছেন ক্রেতার জন্য, আবার কোথাও পণ্য মেপে বড় বস্তা ও ঝুড়িতে তোলা হচ্ছে। নৌকার ওপর দাঁড়িয়েই চলছে দরদাম।

এদিন বাজারে মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, মিষ্টি আলু, লাউ, করলা, পটোল, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, পেঁপে, কচু, কচুর লতি, কাঁচা কলা, ডাব, নারিকেল, কাঁচামরিচ, কলমিশাক, কচুর চারা, বিভিন্ন সবজির চারা, কাঁঠাল ও আমসহ নানা কৃষিপণ্য দেখা যায়।

ছবি: সংগৃহীত

নদীর ওপর ভাসমান চায়ের দোকানও বসে। কোথাও খাবার বিক্রেতা মাইকে ডাক দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণ করছেন। আলাদা করে নারিকেলের বাজার, ধান-চাল ও মুড়ির বাজার, মাছ ধরার সরঞ্জামের বাজারও চোখে পড়ে। ফলে এটি শুধু সবজির হাট নয়; নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বহুমুখী বাণিজ্যকেন্দ্র।

বানারীপাড়ার বিষারকান্দি এলাকার ৭০ বছর বয়সী কৃষক ওসমান গনি জানান, তিনি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এই হাটে সবজি বিক্রি করছেন। তাঁর ভাষ্য, নৌকায় পণ্য এনে দ্রুত বিক্রি করা যায়। ক্রেতার উপস্থিতিও বেশি থাকায় অনেক সময় পণ্য নিয়ে বসে থাকতে হয় না।

মুগারঝোর এলাকার কৃষক আবদুল করিম মোল্লা বলেন, আগে কৃষকেরা ডিঙি নৌকায় করে সবজি নিয়ে আসতেন। স্থানীয় লোকজন নৌকা থেকেই পণ্য কিনতেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। শহরের সবজি ব্যবসায়ীরাও বড় নৌকা ও ট্রলার নিয়ে আসেন। ফলে আগের তুলনায় বাজারের পরিধি বেড়েছে।

তিন উপজেলার কৃষকের মিলনস্থল

এই ভাসমান হাটে শুধু নাজিরপুরের কৃষকরাই আসেন না। নাজিরপুরের কলারদোয়ানিয়া, মুগারঝোর, মনোহরপুর, পদ্মডুবি, বিলদুমুরিয়া, সোনাপুর, গাওখালী, চাঁদকাঠি, সাচিয়া, লাড়া ও পেনাখালীসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা এখানে পণ্য নিয়ে আসেন।

এ ছাড়া নেছারাবাদের বলদিয়া, গগন, মালুহার, কান্তাখালী, ইলুহার ও জনতা এবং বানারীপাড়ার বিষারকান্দি, উমারেরপাড়, উদয়কাঠি, কদমবাড়িয়া ও চৌমোহনাসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরাও নিয়মিত এ বাজারে আসেন।

ছবি: সংগৃহীত

কৃষকেরা সাধারণত ভোরে ডিঙি বা ছোট নৌকায় করে পণ্য নিয়ে হাটে পৌঁছান। এরপর পাইকার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য বিক্রি করেন। এতে একদিকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারজাত হয়, অন্যদিকে পাইকাররাও একই জায়গা থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য সংগ্রহের সুযোগ পান।

পরিবহনব্যবস্থা বদলেছে, বেড়েছে খরচও

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সময়ের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। আগে ছোট নৌকাই ছিল কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রধান বাহন। এখন বড় ট্রলার, ইঞ্জিনচালিত নৌযান ও সড়কপথের যানবাহনও যুক্ত হয়েছে। ফলে দূরবর্তী এলাকার পাইকারদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।

তবে নদীর নাব্যতা কমে গেলে বড় নৌযান চলাচলে সমস্যা হয়। তখন পণ্য পরিবহনে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়, এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু হাট নয়, পর্যটনেরও সম্ভাবনা

ভাসমান এই হাট দেখতে শুধু স্থানীয় মানুষই নয়, দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে আসেন। সারি সারি নৌকা, নদীর ওপর বেচাকেনা, কৃষকের ব্যস্ততা এবং দক্ষিণাঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। স্থানীয়দের দাবি, পরিকল্পিতভাবে প্রচার ও অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এই ভাসমান হাটকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয়রা আরো জানায়, দেশের বাইরের কিছু দর্শনার্থীও বিভিন্ন সময়ে এই বাজার দেখতে এসেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভেলাবাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনও হয়েছে। ফলে কৃষিপণ্য কেনাবেচার পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।

তবে পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা, যাতায়াতের সুবিধা, নিরাপদ নৌযান, খাবার ও থাকার ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এসব সুবিধা তৈরি করা গেলে বৈঠাকাটা ভাসমান হাটকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হতে পারে।

নদীর বুকে টিকে আছে পুরোনো ঐতিহ্য

বেলুয়া নদীর এই হাট শুধু কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জায়গা নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের নদীনির্ভর জীবন ও বাণিজ্যের দীর্ঘ ঐতিহ্যেরও প্রতিচ্ছবি। একসময় যে নদীপথ ছিল মানুষের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম, সময়ের পরিবর্তনে সেই নদীর বুকেই এখনো সপ্তাহে দুই দিন জমে ওঠে কৃষিপণ্যের বড় বাজার।

সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌকার সংখ্যা কমতে থাকে। বিক্রি শেষ করে কৃষকেরা ফিরে যান নিজ নিজ গ্রামে। পাইকাররা পণ্য নিয়ে ছুটে যান শহরের বাজারের দিকে। আবার পরবর্তী শনিবার বা মঙ্গলবারের অপেক্ষায় থাকে বেলুয়া নদী।

ছবি: সংগৃহীত

নদীর স্রোতের সঙ্গে বদলেছে বাজারের ধরন, বেড়েছে যোগাযোগের মাধ্যম; কিন্তু নৌকায় নৌকায় পণ্য বেচাকেনার সেই পুরোনো ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। কৃষক, ব্যবসায়ী, মাঝি আর নদী সব মিলিয়ে বৈঠাকাটার এই ভাসমান হাট যেন দক্ষিণাঞ্চলের জীবন্ত কৃষি-অর্থনীতির এক অনন্য ছবি।

বছরে বেচাকেনা প্রায় ৪০-৫০ কোটি টাকা

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, বৈঠাকাটা এলাকার ভাসমান হাটটি কৃষিপণ্য বেচাকেনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। নৌকার ওপর বসা এই বাজারে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফলমূল, কৃষিপণ্য ও চারা কেনাবেচা হয়। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার ভোর থেকেই কৃষক ও পাইকাররা এখানে জড়ো হন।

তিনি বলেন, এ হাটের বিশেষত্ব হলো কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্য সরাসরি নৌকায় করে নিয়ে এসে বিক্রি করতে পারেন। একই সঙ্গে পাইকাররা এক জায়গা থেকে বড় পরিমাণ পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। এতে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হয়।

সৌমিত্র সরকার আরও জানান, এই বাজারকে ঘিরে বছরে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার কৃষিপণ্যের বেচাকেনা হয়। কৃষক, পাইকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নৌকার মাঝিসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বাজারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে বৈঠাকাটা ভাসমান হাটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা বলেন, নদী ও কৃষিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এমন বাজার দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কৃষিবাণিজ্যের একটি উদাহরণ। তবে নৌপথের নাব্যতা কমে গেলে কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। তাই নৌপথের স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় রাখা এবং বাজারের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।

এম.সি. এইচ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত