‘একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না’ এই নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে গাজীপুরে আয়োজিত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে।
সোমবার (২৩ জুন) দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভাওয়াল সম্মেলন কক্ষে গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যৌথভাবে অনুষ্ঠাটি আয়োজন করে। এ অনুষ্ঠানে মোট ৩৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে ১ কোটি ১ লাখ টাকার অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বজনহারাদের কান্না, আহতদের অসহায়ত্ব এবং পঙ্গুত্বের বেদনাময় গল্পে পরিবেশ হয়ে ওঠে আবেগঘন। অনুদানের অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা হলেও হারিয়ে যাওয়া জীবন বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা এর নেই—এ কথাই উঠে আসে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠে।
অনুদানপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন ৩০ বছর বয়সী রুনা খাতুন। কোলে দুই বছরের শিশুসন্তান নিয়ে তিনি পাঁচ লাখ টাকার চেক গ্রহণ করেন। এক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তার স্বামী, যিনি ছিলেন ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার চালক।
আবেগাপ্লুত রুনা খাতুন বলেন, ১৫ বছরের ড্রাইভিং অভিজ্ঞতাও আমার স্বামীকে বাঁচাতে পারেনি। এই টাকা দিয়ে আমি কী করব? আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটিই তো হারিয়ে ফেলেছি।
বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের মৃত্যুজনিত শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন ৯০ বছর বয়সী তুলা শেখও। এক বছর আগে রাস্তা পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনায় নিহত হন তার ছেলে। অনুদানের চেক গ্রহণের সময় তিনি বলেন, আমার যাওয়ার বয়স হয়েছিল, কিন্তু চলে গেল আমার ছেলে। এমন দুর্ঘটনা যেন আর কোনো বাবার জীবনে না আসে।
আরেক ভুক্তভোগী জীবন প্রসাদ সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীকে হারানোর পাশাপাশি নিজেও স্থায়ীভাবে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্রাচে ভর দিয়ে মঞ্চে উঠে তিনি অনুদানের চেক গ্রহণ করেন। তিনি জানান, মহাসড়কে অটোরিকশা দুর্ঘটনায় তার স্ত্রীর মৃত্যু হয় এবং তিনি নিজেও গুরুতর আহত হন। সেই ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতি এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
ঢাকার কারওয়ানবাজারের দিনমজুর মো. সোনু মিয়ার জীবনও বদলে গেছে এক সড়ক দুর্ঘটনায়। একটি ট্রাকের চাপায় তিনি হারিয়েছেন একটি পা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে এখন তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ।
তিনি বলেন, আমার একটা পা চলে গেছে, কিন্তু আমার ছোট দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে? ওদের কে দেখবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো চেকে লেখা থাকে না।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে একটি হরিণ বা হাঁসের ঝাঁক রাস্তা পার হলেও হাইওয়ের গাড়িগুলো থেমে যায়। আমাদের দেশে চালকদের মধ্যে সেই ধৈর্য ও সচেতনতার অভাব রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে কমগতির যানবাহন যেমন অটোরিকশা ও সাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জেলা প্রশাসক জানান, গাজীপুরের মহাসড়কসংলগ্ন হকারদের পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাইপাস সড়ক নির্মাণ ও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে আকস্মিক শ্রমিক আন্দোলন বন্ধ এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণের মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এসএম আশরাফুল আলম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুনসহ জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, এনজিও প্রতিনিধি ও সুধীজন।
অনুষ্ঠিতে বক্তারা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণহানি নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দেয়। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
টিকিট না পেয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ, রেল সেতুর ধাক্কায় ঠিকাদারের মৃত্যু
শরীয়তপুরে বিএনপির কার্যালয়ে দুর্বৃত্তদের অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুর
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিখোঁজের ২৪ ঘণ্টা পর মিলল শিশুর মরদেহ
আ.লীগের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে কুড়িগ্রামে বিএনপির বিক্ষোভ
বাজেট বরাদ্দের দাবিতে ঝিনাইদহে আইনজীবীদের মানববন্ধন