বেলাই বিলে শাপলার ডাটা সংগ্রহ করে চলে যাদের পরিবার

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ১০:০৫ পিএম
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার মোয়ানি গ্রামের বাসিন্দা মুক্তাজুল ইসলাম (৩০), আরিফ রাজ (২৪), ফারুখ মিয়া (৪৬) ও মিলন মিয়া (৪০) একদিন পরপর ভোরে বেলাই বিলে নামেন। বিল থেকে সংগ্রহ করা শাপলার ডাটা রাজধানী ঢাকার রায়েরবাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। এই আয়ের ওপরই নির্ভর করে তাদের চারটি পরিবারের সংসার।
 
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার আগেই ছোট নৌকা নিয়ে বেলাই বিলের গভীরে চলে যান তারা। বিলজুড়ে ফুটে থাকা শাপলার নিচে ডুবে থাকা ডাটা বিশেষ কৌশলে ‘কুষা’ দিয়ে সংগ্রহ করতে হয়। পানির নিচে হাতড়ে হাতড়ে শাপলার ডাটা তুলে নৌকায় জমা করেন তারা। কখনো কোমরসমান, কখনো বুকসমান পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়।
 
২৪ বছর বয়সী আরিফ রাজ বলেন, ‘অনেকে মনে করেন শাপলা তোলা সহজ কাজ। কিন্তু বাস্তবে এটা খুবই কষ্টের। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে থাকতে হয়। বৃষ্টি, ঝড় বা রোদ—সবকিছুর মধ্যেই কাজ করতে হয়। তারপরও সংসারের কথা ভেবে এই কাজ করে যাচ্ছি।’
তিনি জানান, শীত কিংবা বর্ষা—প্রতিটি মৌসুমেই এই কাজের আলাদা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্ষাকালে পানির স্রোত ও গভীরতা বাড়ে, আর শীতকালে ঠান্ডা পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
 
৪৬ বছর বয়সী ফারুখ মিয়া বলেন, ‘আমাদের কোনো নির্দিষ্ট মাসিক আয় নেই। শাপলার মৌসুমে যতটুকু আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করি। কাজটা কষ্টের হলেও অভাবের কারণে ছাড়তে পারি না।’
অন্যদিকে ৪০ বছর বয়সী মিলন মিয়া জানান, ‘ভোরে কাজ শুরু করি, দুপুর পর্যন্ত বিলে থাকি। এরপর শাপলা বাছাই, পরিষ্কার এবং বাজারে পাঠানোর কাজ করতে হয়। দিন শেষে শরীর আর চলে না।’
 
মুক্তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চারজন মিলে ভোর রাত ৪টায় বিলে নামি। সকাল থেকে প্রায় দুপুর পর্যন্ত শাপলার ডাটা তুলি। এরপর সেগুলো পরিষ্কার করে বস্তায় ভরে ঢাকার রায়েরবাজারে পাঠাই। একদিন পরপর এই কাজ করি। অন্য কোনো কাজ জানি না, এই শাপলাই আমাদের সংসার চালায়।’
তিনি জানান, তার পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধ মা ও তিন সন্তান। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। শাপলার মৌসুমে যে আয় হয়, তা দিয়েই বছরের অনেকটা সময় সংসার চালাতে হয়।
 
শাপলার ডাটার বাজার ভালো থাকলে একবার বিক্রি করে প্রায় ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে এই টাকার পুরোটা তাদের হাতে থাকে না। ঢাকায় পণ্য পাঠাতে পরিবহন খরচ হয় প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং বিক্রির জন্য ভিট ভাড়া দিতে হয় আরও ১ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ চারজন সমানভাবে ভাগ করে নেন।
মুক্তাজুল বলেন, ‘২৪ হাজার টাকা বিক্রি হলেও প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এরপর যা থাকে, তা আমরা চারজন ভাগ করে নিই। সেই টাকাতেই সংসার চালাতে হয়।’
 
স্থানীয়দের মতে, বেলাই বিল শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত নয়; এটি বহু নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। বর্ষা মৌসুমে বিলজুড়ে শাপলার সমারোহ দেখা যায়। এই শাপলার ডাটা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয় একটি সবজি হিসেবে বিক্রি হয়।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় বেলাই বিলের আশপাশের শত শত পরিবার মাছ ধরা, শাপলা সংগ্রহ এবং বিভিন্ন জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সময়ের পরিবর্তনে সেই সংখ্যা কমে এলেও এখনো অনেক পরিবার এই বিলের ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে।
 
প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনের এই লড়াই হয়তো শহরের মানুষের চোখে খুব একটা ধরা পড়ে না। কিন্তু ভোরের অন্ধকারে ঘুম ভেঙে, কাদা আর পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করে যে শাপলার ডাটা রাজধানীর বাজারে পৌঁছায়, তার পেছনে লুকিয়ে আছে চারজন শ্রমজীবী মানুষের কঠোর পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প।
MCH
আরও পড়ুন