বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে পাঠদান, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২ এএম

প্রতিষ্ঠার ১৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত সংকট কাটেনি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বগুড়া ইউনিয়নের নাগেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। জরাজীর্ণ দুটি ভবনের ছাদ ও দেয়ালে ফাটল, কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা, আবার কোথাও বেরিয়ে এসেছে রড। ভেঙে গেছে দরজা-জানালা। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে ছাদে পলিথিন বিছিয়েও রক্ষা মিলছে না। শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে ভিজে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ও পোশাক। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাতে হচ্ছে।

শুধু বৃষ্টির সময়ই নয়, গরমেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় শিক্ষার্থীদের। কোথাও ছাদ থেকে বালি-খোয়া খসে পড়ছে, কোথাও দেয়ালের ইট খুলে পড়ছে। ভবনের কোনো অংশ যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যেই চলছে নিয়মিত ক্লাস। এর সঙ্গে রয়েছে শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট। পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় স্টোররুমেও পাঠদান করতে হচ্ছে। ভাঙা বোর্ডের কারণে ক্লাস নেওয়া ও লেখাপড়ায়ও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

বিদ্যালয়ের মাঠের অবস্থাও ভালো নয়। সেখানে প্রায়ই পানি জমে থাকায় খেলাধুলা বন্ধ থাকে। অনেক সময় নিয়মিত অ্যাসেম্বলিও করা সম্ভব হয় না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্তানদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনেক সময় তারা বিদ্যালয়ে যেতে নিষেধ করেন। কেউ কেউ ভয়ে স্কুলে আসতেও চায় না। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৮১ সালে ৭৪ শতাংশ জমির ওপর নাগেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। তবে দীর্ঘ ১৪৫ বছরেও বিদ্যালয়টি কোনো একাডেমিক ভবন বরাদ্দ পায়নি। ১৯৮০ সালে একটি বিজ্ঞান ভবন এবং ১৯৯৭ সালে ফ্যাসিলিটিজ বিভাগের মাধ্যমে আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর ভবন দুটিও এখন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নতুন ভবনের জন্য শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে একাধিকবার আবেদন করা হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে পাঠদান কক্ষ, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, সহকারী শিক্ষকদের কক্ষ ও অফিসসহ মোট ১১টি কক্ষ রয়েছে। এর অধিকাংশের অবস্থাই নাজুক। দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরেছে। কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে, আবার কোথাও দেয়াল ভেদ করে রড বেরিয়ে এসেছে। পুরোনো টিনশেড ঘরটির অবস্থাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দরজা-জানালা ভেঙে গেছে এবং দেয়ালের ইট খসে পড়ছে। ফলে সেটিও যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের এমন পরিবেশ তাদের পড়াশোনায়ও প্রভাব ফেলছে। বৃষ্টির সময় শ্রেণিকক্ষে পানি পড়া, গরমে টিনের চালার অতিরিক্ত উত্তাপ, মাঠে জলাবদ্ধতা এবং ভবন ধসের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিক্ষার্থী সেজুতি বলেন, ‘আমরা অনেক ঝুঁকি আর ভয় নিয়ে ক্লাস করি। মাঝে মাঝে ছাদ থেকে বালি-খোয়া পড়ে শরীরে। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। অন্যদের বিদ্যালয় কত সুন্দর, আর আমাদের বিদ্যালয়ের অবস্থা খুব খারাপ। আমরা নিরাপদ ভবন চাই।’

আরেক শিক্ষার্থী ফেরদৌসী খাতুন বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়টি অনেক পুরোনো। কিন্তু এখনো ভালো ভবন নেই। বোর্ড ভাঙা থাকায় লিখতেও সমস্যা হয়। আমরা চাই দ্রুত বিদ্যালয়ের নতুন ভবন করা হোক।’

অভিভাবক রানা হাসান বলেন, ‘১৪৫ বছরের বিদ্যালয়টির অবস্থা খুবই খারাপ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস করছে। নতুন ভবন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত ভবন নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।’

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, শুধু একটি নতুন ভবন নির্মাণ করলেই দীর্ঘদিনের সব সমস্যার সমাধান হবে না। স্থায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ১৪৫ বছরের পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের দাবিও রয়েছে তাদের।

শিক্ষক প্রদীপ মন্ডল বলেন, ‘এই বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সংকটের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা দ্রুত নতুন একাডেমিক ভবন চাই। পাশাপাশি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হলে শিক্ষা কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হবে।’

আরেক শিক্ষক সুমন রানা বলেন, ‘১৪৫ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠান হয়েও এখনো আমাদের অনেক মৌলিক সংকট রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস নিতে হয়। রুমের অভাবে স্টোররুমেও পাঠদান করতে হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত নতুন ভবনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানাই।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুকুল হোসেন বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই টিনশেড ঘরসহ ভবন দুটি ঝুঁকিপূর্ণ। একটি একাডেমিক ভবনের জন্য দীর্ঘদিন বিভিন্ন মহলে আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। টিনশেড ঘরটিও যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। বিদ্যালয়ে নতুন ভবন বরাদ্দ এখন অত্যন্ত জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়টি ১৪৫ বছরের পুরোনো। দীর্ঘদিন ধরে এখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

ঝিনাইদহ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, ‘যে সমস্ত বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ আছে সেগুলো আমাদের নজরে আছে। ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন। আশা করছি দ্রুত বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর স্থানে নতুন ভবন তৈরি হবে।’

এমইউ
আরও পড়ুন