চলনবিলে শিকারির ফাঁদে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে চলনবিলে আসতে শুরু করেছে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় বিলাঞ্চলে ছোট মাছের প্রাচুর্য দেখা দিয়েছে। খাবারের সন্ধানে জলাভূমিতে ভিড় করছে বক, বালিহাঁস, মাছরাঙা, সারস ও পানকৌড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। কিন্তু পাখিদের অবাধ বিচরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিকারিরা। নানা কৌশলে পাতা ফাঁদে প্রতিদিনই আটকা পড়ছে অসংখ্য পাখি। আইন থাকলেও শিকার বন্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশকর্মীরা।

পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, বর্ষার পানি কমে যাওয়ায় চলনবিলের বিভিন্ন জলাশয়ে পুঁটি, খলসে ও দারকেসহ ছোট মাছের দেখা মিলছে। এসব মাছের আকর্ষণে দেশি পাখির পাশাপাশি পরিযায়ী পাখিরাও বিলাঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছে। এক বিল থেকে অন্য বিলে উড়ে বেড়ানো পাখিদের এই উপস্থিতি শীতের প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করে তুললেও শিকারিদের তৎপরতায় হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

চলনবিল এলাকায় পাখি শিকারের বহুল ব্যবহৃত কৌশলগুলোর একটি হলো পোষা বক দিয়ে অন্য বক ধরা। বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা, খেজুরের ডাল ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয় ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু ফাঁদঘর। কোথাও কোথাও এসব ফাঁদকে ‘কিল্লা ঘর’ বলা হয়। ফাঁদের সামনে বাঁশের উঁচু ডালে বসিয়ে রাখা হয় পোষা বক। আকাশে বকের ঝাঁক উড়ে যাওয়ার সময় শিকারি পোষা বকটিকে নড়াচড়া করান। বকটি ডাকাডাকি শুরু করলে উড়ে যাওয়া পাখিরা ফাঁদের ওপর বসতে আকৃষ্ট হয়। তখন আড়ালে থাকা শিকারিরা একে একে পাখিগুলো ধরে খাঁচায় ভরেন। এ ছাড়া বড়শিতে মাছ গেঁথে পাখি ধরার পাশাপাশি বিষটোপ ও ধানখেতে আড়াআড়িভাবে পাতা জাল ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ফাঁদে পড়ে অনেক পাখি মারা যাচ্ছে, আবার কিছু পাখি জীবিত অবস্থায় শিকারিদের হাতে ধরা পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে বন্দুক দিয়েও পাখি শিকার করেন। শিকার করা পাখি নিজেদের খাওয়ার পাশাপাশি বস্তায় ভরে বিক্রি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিকার করা পাখি প্রভাবশালীদের বাড়িতেও পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি প্রায় দুই শতাধিক কোয়েল পাখি জালে আটকে হাটে বিক্রির জন্য নেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের শেষ ভাগ থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এসব পাখি শিকার করা হয়েছিল। শিকার করা পাখি নিয়ে কেউ কেউ হাটবাজারে ফেরি করেও বিক্রি করেন।

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বক বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। একটি বালিহাঁসের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং চাকলা পাখি বিক্রি হচ্ছে জোড়া ১৯০ টাকায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিকারি জানান, তারা বিভিন্ন এলাকার ফসলের মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কলাপাতা ও খেজুরের ডাল দিয়ে ফাঁদ তৈরি করেন। বিষটোপ ব্যবহার করেও পাখি শিকার করা হয়। ভোরে দল বেঁধে বিলে গিয়ে কেউ কেউ ১০টি থেকে শুরু করে শতাধিক পাখি শিকার করেন বলে তাদের দাবি।

চলনবিলে পাখি শিকার বন্ধে স্থানীয় কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করছে। তারা শিকারিদের ফাঁদ থেকে পাখি উদ্ধার করে মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি সচেতনতামূলক প্রচারণা চালায়। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি। সংগঠনটির সদস্যদের সহযোগিতায় শনিবার(১৭ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের সিংড়ায় বক দিয়ে বক শিকারের অভিযোগে তিনজনকে কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় চলনবিলের আগমুরশন, বামিহাল, কাকিয়ান ও পূর্বভেংড়ী বিল থেকে বক শিকারের কাজে ব্যবহৃত পোষা ও শিকার করা অর্ধশতাধিক বক উদ্ধার করা হয়। অভিযানে ধানখেতে তৈরি ১০টি ‘কিল্লা ঘর’ ফাঁদও ধ্বংস করা হয়। পরে সিংড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের উপস্থিতিতে উদ্ধার করা পাখিগুলো মুক্ত আকাশে অবমুক্ত করা হয়।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, চলনবিলের ধানখেতে নিয়মিত ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় পাখিগুলো উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হয়েছে। এ সময় স্থানীয়দের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করা হয়।

চলনবিলের জলাভূমি শুধু মাছ ও কৃষির জন্য নয়, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাস ও খাদ্যসংস্থানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বিচারে পাখি শিকার চলতে থাকলে জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশকর্মীদের মতে, শিকারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, ফাঁদ ও বিষটোপের ব্যবহার বন্ধ, পাখি কেনাবেচা প্রতিরোধ এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে শিকারিদের পেছনে থাকা ক্রেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শীতের অতিথি পাখির কলতানে চলনবিলের প্রকৃতি যখন নতুন রূপ পায়, তখন সেই সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

জেএম
আরও পড়ুন