খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের গাফিলতি, আসছে ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪২ এএম

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগে দেশের ১১ শিক্ষা বোর্ডের প্রায় আট হাজার শিক্ষক শাস্তির মুখে পড়েছেন। চলতি বছরের পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে বিপুলসংখ্যক অসংগতি ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে গত বছরের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে গাফিলতির বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অনিয়মের মাত্রা অনুযায়ী কোনো কোনো শিক্ষককে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হতে পারে। আর ইচ্ছাকৃত বা গুরুতর অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশোধিত পাবলিক পরীক্ষা আইনের আওতায় আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

‘অনুচিত নম্বর’ নির্ধারণে আসছে নীতিমালা

খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কতটা বেশি বা কম নম্বর দেওয়া হলে সেটিকে অনিয়ম হিসেবে গণ্য করা হবে, তা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এ জন্য একটি পৃথক ‘পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় ওভার মার্কিং বা অতিরিক্ত নম্বর এবং আন্ডার মার্কিং বা কম নম্বর দেওয়ার একটি গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে নম্বর দেওয়া পরীক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বোর্ডগুলোর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি তুলে ধরা হবে। মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়ার পর নীতিমালা প্রণয়নের জন্য কমিটি গঠন করা হবে।

সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ওভার নাম্বারিং-আন্ডার নাম্বারিংয়ের বিষয়ে যেসব শিক্ষকের ত্রুটি রয়েছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নীতিমালা কমিটি যাচাই-বাছাই করে কত নম্বরকে অনুচিত নম্বর হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নির্ধারণ করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পুনর্নিরীক্ষণে বদলে গেছে হাজারো শিক্ষার্থীর ফল

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণে বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্রে অসংগতি ধরা পড়ে। গত ১০ আগস্ট দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ফল প্রকাশ করা হয়। পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।

ফল প্রকাশের পর ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন গ্রহণ করা হয়। এ সময়ে ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ শিক্ষার্থী আবেদন করে। একাধিক বিষয়ের খাতা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করায় মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্র এ প্রক্রিয়ার আওতায় আসে।

এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি।

পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, ৪ হাজার ৫৮৫ শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছে। নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন। গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের। এ ছাড়া ৫৬ হাজার ২৫৯টি উত্তরপত্রে নম্বর পরিবর্তন হয়েছে।

যশোর বোর্ডেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ১,৬৮৪ পরীক্ষকের বিরুদ্ধে

খাতা মূল্যায়নে ভুল ও গাফিলতির অভিযোগে ইতোমধ্যে পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডের ১ হাজার ৬৮৪ জন প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষককে আগামী দুই বছর কোনো পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী বলেন, নির্ভুল ফল প্রকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি বা ভুল করা পরীক্ষকদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকের পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।

বোর্ড সূত্র জানায়, পুনর্নিরীক্ষণের পর যশোর শিক্ষা বোর্ডে ২ হাজার ৪৩৬ পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ফেল করা ৩৮০ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ১ হাজার ৩০৪ জনের। নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৫২ জন।

পুনর্নিরীক্ষণের ফল বিশ্লেষণ করে খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি বা ভুল করা পরীক্ষকদের শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বোর্ড সূত্র।

গুরুতর অনিয়মে হতে পারে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ইচ্ছাকৃত অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশোধিত পাবলিক পরীক্ষা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে অনুমোদিত সংশোধিত আইনে পাবলিক পরীক্ষার ফল বা মেধাতালিকায় হ্যাকিং কিংবা অবৈধ পরিবর্তনকে নতুন অপরাধ হিসেবে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি জানিয়েছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ওভার মার্কিং ও আন্ডার মার্কিংয়ের অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তে ইচ্ছাকৃত অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশোধিত আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাতা মূল্যায়নের সময় সাধারণ ভুল, অসাবধানতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর বাড়ানো বা কমানোর ঘটনা একভাবে দেখা উচিত নয়। এ কারণেই ‘অনুচিত নম্বর’-এর একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কারিগরি বোর্ডে ৩৪ কেন্দ্র সচিবকে শোকজ

এদিকে পরীক্ষা পরিচালনায় গাফিলতির অভিযোগে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ৩৪টি কেন্দ্রের সচিবকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।

গত রোববার জারি করা ওই নোটিশে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র সচিবদের আগামী ৭ অক্টোবরের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষার ফলের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়ানো জরুরি। এবারের পুনর্নিরীক্ষণে বিপুলসংখ্যক ফল পরিবর্তনের পর পরীক্ষকদের দায়িত্ব ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন