সোসাইটি ফর দি এনভায়রনমেন্ট মুভমেন্টের চেয়ারম্যান ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুল লতিফ জনি বলেছেন, নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের পরিবেশ। দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারকে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে, কোন কোন বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে তা তুলে ধরেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ( ২ মার্চ) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে সোসাইটি ফর দি এনভায়রনমেন্ট মুভমেন্ট আয়োজিত পরিবেশ রক্ষায় করণীয় শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ১৭ টি বিষয়ে তুলে ধরেন।
লিখিত বক্তব্যে বিএনপির সাবেক দফতর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি বলেন, গত ১৭ বছর সারা বাংলাদেশে লুটপাট ও দখলের রাজত্ব কায়েম করে পাহাড়, বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে এবং নদীগুলো ভরাট করে নদীমাতৃক বাংলাদেশের হাজার বছরের বহমান নদীগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। যার কারণে আজ বাংলাদেশের পরিবেশ ভারসাম্যহীনতা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের মানুষ প্রতিনিয়ত অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হচ্ছে। নদী ভরাটকারী, পাহাড় ধ্বংসকারী, বন উজারকারী ইটের ভাটা তৈরি করে, এসব পরিবেশ দূষণ কারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নিলে, সেদিন বেশি দূরে নয় বাংলাদেশের উর্বর ফসলীক্ষেত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য প্রজনন স্থান এবং বনে বসবাসকারী প্রাণীসম্পদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই সুষ্ঠ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সরকারের নৌ পরিবহন মন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি। উল্লেখিত বিষয়গুলোকে প্রধান্য দিয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য রক্ষা করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।
আবদুল লতিফ জনি পরিবেশ সুরক্ষায় ১৭ টি বিষয়ে তুলে ধরে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শীতলক্ষ্যা নদীর উপরে নির্মিত কাঁচপুর ব্রিজ থেকে কুমিল্লার গোমতী নদীর উপর নির্মিত দাউদকান্দি ব্রিজ পর্যন্ত যতগুলো নদী বহমান ছিল, একমাত্র মেঘনা নদী ছাড়া, মেঘনা নদীর শাখা নদীগুলো ভরাট করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যার ফলে নদী ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে নদীমাতৃক বাংলাদেশের যখন তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল তখন শহীদ রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ফেনী নদীর মোহনায় মুহুরী প্রকল্প এবং ছোট ফেনী নদীর মোহনায় মুছাপুর ব্যারেজ প্রকল্প চালু করেন। এই প্রকল্পগুলো সমুদ্রের নোনা পানির জোয়ারের সময় ফসলের যাতে ক্ষতি না হয় এবং শুকনো মৌসুমে মিঠা পানি জমিয়ে রেখে ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, ভারত আন্তর্জাতিক নদী আইন অমান্য করে ফারাক্কা বাঁধ এবং সুরমা নদীর উপর টিঁপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করে যা বাংলাদেশের নদী এবং জলাশয়গুলো ধ্বংসের একটি বড় কারণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নৌ পরিবহন মন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর কাছে ফারাক্কা বাঁধের ন্যায্য জলবন্টন চুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল (অব.) আবু সাঈদ মো. মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম এ মহি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রফিকুল্লাহ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে রামপুরা থেকে গুলশান, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও মগবাজার রাস্তা পর্যন্ত বিশাল জলাধার দখলমুক্ত করে হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাতিরঝিলে দৃষ্টিনন্দন পার্ক, নান্দনিক জলাশয় ও পরিবেশ বান্ধব রাস্তা তৈরি করে ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে এবং জনবহুল এই নগরের মানুষের অবসরে নিঃশ্বাস ফেলার ব্যবস্থা করেছেন তা জাতি শ্রদ্ধাভরে অজীবন স্মরণ রাখবে বলে জানান আবদুল লতিফ জনি।
হাতিরঝিলের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, হাতিরঝিলকে যেভাবে দখলমুক্ত করে দৃষ্টিনন্দন পার্ক, নান্দনিক জলাশয় ও পরিবেশ বান্ধব রাস্তা তৈরি করেছে ঠিক সেরূপ ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সেনানিবাস ও সাভারের ঐতিহ্যবাহী সেনানিবাসের মাঝখানে যে বিশাল আশুলিয়া জলাধার, যা গাজীপুরের কোনাবাড়ী ব্রিজ থেকে ঢাকা মিরপুরের গাবতলী ব্রিজ পর্যন্ত জলাধারকে অবৈধ (গত ১৭ বছর) দখল করে যারা নিজস্ব বাংলোবাড়ী ক্লাব এবং বিনোদন কেন্দ্র (রির্সোট) তৈরি করেছে তাদের থেকে এই জলাধার পুনরুদ্ধার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ এবং বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েরকে কাজে লাগিয়ে হাতিরঝিলের অনুরূপ দৃষ্টিনন্দন পার্ক, নান্দনিক জলাশয় ও পরিবেশ বান্ধব রাস্তা তৈরি করে ঢাকার মত দূষিত পরিবেশ দূর করে নগর জীবনকে সবুজ শ্যামল এবং দূষনমুক্ত পরিবেশ উপহার দিবেন এই দাবি জানাচ্ছি।
তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গা, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা নদীগুলো এবং জলাশয়গুলো যারা অবৈধভাবে বালু ভরাট করে জলাশয় ভরাটের নিষিদ্ধ আইন-অমান্য করেছে তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
আবদুল লতিফ জনি বলেন, তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গা, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা নদীগুলো ভরাট করে নদীগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক বারিধারার কূটনৈতিক এলাকায় আমেরিকান দূতাবাসের সামনে থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জলসিড়ি প্রকল্প পর্যন্ত নির্মিত ১০০ ফিট রাস্তায় নদীর উপর অবস্থিত ব্রিজ আছে কিন্তু নদী দৃশ্যমান নাই। নদী, শাখা নদী, খাল-বিল, জলাশয় ভরাট করে নদীমাতৃক বাংলাদেশের ধ্বংস করছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে পরিবেশ দূষণ করছে।
গত ১৭ বৎসরে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় যে সকল প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কাদেরকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা জনসম্মুখে প্রকাশ এবং গুলশান, বনানী, বারিধারায় নির্মিত ভবনগুলোর ১০ তলার উপরে বহুতল ভবনের নির্মানের অনুমতি গত ১৭ বছর কাদেরকে দেওয়া হয়েছে এবং কিভাবে দেওয়া হয়েছে তা জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকায় ঢাকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য সিভিল এভিয়েশন ও আন্তর্জাতিক এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত আইন মেনে বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে কি না, যদি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত আইন মেনে ভবন নির্মাণ না করে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান আবদুল লতিফ জনি।

