আসছে ‘মেগা এল নিনো’, ভাঙবে কী শতাব্দীপ্রাচীন রেকর্ড?

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এল নিনো, আর এবার সেটি হতে পারে আরও তীব্র, আরও বিস্তৃত, এক কথায় ‘মেগা এল নিনো’। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়ে এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে, যা বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেবে। খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ সবকিছুর তীব্রতা একসঙ্গে বাড়তে পারে।

ইতিহাসের সতর্কবার্তা

১৮৭৭-১৮৭৮ সালের ভয়াবহ এল নিনো দুর্যোগ ১৮৭৭-১৮৭৮ আজও মানবসভ্যতার জন্য এক শোকাবহ স্মৃতি। সেই সময় দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তাপপ্রবাহে বিশ্বের বিপুল জনগোষ্ঠী দুর্ভিক্ষে পড়ে। বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সেই মাত্রার না হলেও বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

উপমহাদেশে আগাম সংকেত

বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে ইতোমধ্যেই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা এই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে। এপ্রিলেই ৪০ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলা তাপমাত্রা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছকে নেই। প্রাক-বর্ষার বৃষ্টি কমে যাচ্ছে, কালবৈশাখীর দেখা মিলছে না, আর বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে উচ্চচাপ বলয় তৈরি হয়ে ‘হিট ডোম’ পরিস্থিতি তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র আর্দ্রতা, যার ফলে অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি হয়ে উঠছে এবং মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কষ্টকর হয়ে পড়ছে।

বৈশ্বিক প্রভাব: একসঙ্গে বিপরীত চিত্র

এই সম্ভাব্য মেগা এল নিনো বিশ্বজুড়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পানির সংকট দেখা দিতে পারে, যেখানে মৌসুমি বায়ুর ব্যর্থতা বড় ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশে অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাছসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর চাপ বাড়বে, যা সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। এই সামগ্রিক চিত্রই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এর জটিল প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে।

কৃষি ও অর্থনীতিতে চাপ

মৌসুমি বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া সরাসরি কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ধান, গমসহ প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এর ফলে অর্থনীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

সতর্কতা ও প্রস্তুতি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা যদি মে-জুনে আরও বাড়তে থাকে, তাহলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তাই দিনের সবচেয়ে গরম সময় এড়িয়ে চলা, শরীরকে পর্যাপ্ত পানি ও লবণাক্ত তরলে সজীব রাখা এবং অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার মতো সতর্কতাগুলো এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য ‘মেগা এল নিনো’ শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, এটি হতে পারে এক বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সংকটের সূচনা, যার প্রভাব পড়বে পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানবজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।

AS
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত