জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর একটি নতুন পর্ব আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন সতর্ক দিয়েছে জাতিসংঘ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলতি বছরের বাকি সময় জুড়ে এই এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিশ্বের বহু অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হতে পারে এবং একে ‘সুপার’ এল নিনোও বলা হতে পারে।

বাতাসের প্রবাহের ধরন পরিবর্তিত হলে উষ্ণ জলরাশি ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, আর তখনই এল নিনোর সৃষ্টি হয়। অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, এবারের ঘটনাটি অস্বাভাবিক মাত্রার শক্তিশালী হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিসের মাস থেকে দশকভিত্তিক পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেইফ বলেন, ‘আমরা প্রায় নিশ্চিত যে একটি বড় ধরনের ঘটনা আসছে। এটি আগের সব রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে।’
বিজ্ঞানীরা এমন আশঙ্কা করছেন কেন, তার একটি বড় কারণ লুকিয়ে আছে সমুদ্রের গভীরে। স্যাটেলাইট, বয়া (ভাসমান যন্ত্র) ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিকের তুলনায় কোনো কোনো জায়গায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উষ্ণ বিশাল জলরাশি শত শত মিটার গভীর থেকে ধীরে ধীরে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনওএএ ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের বিজ্ঞানী মিশেল এল’হ্যুরো বলেন, ‘এই গভীর সমুদ্রের উষ্ণতা আমরা যেসব শক্তিশালী এল নিনো ঘটনা দেখেছি, তাদের কয়েকটির সঙ্গেই তুলনীয়।’
সমুদ্রের গভীরের এই অতিরিক্ত তাপ সাধারণত পরবর্তী সময়ে পানির উপরিতলে উঠে আসে। সেই উষ্ণ পানি আবার বাতাসকে উত্তপ্ত করে এবং বিশ্বের নানা অঞ্চলের আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত করে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এল নিনো ইতোমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর আগুনে আরও জ্বালানি ঢেলে দেবে। এর প্রভাব আরও তীব্র হবে, আরও দূর ছড়াবে এবং ভয়াবহ গতিতে সীমান্ত অতিক্রম করবে।

সব এল নিনো এক রকম হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল বছরের ভিন্ন সময়ে এর প্রভাব অনুভব করতে পারে। তবে শক্তিশালী এল নিনো সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া সৃষ্টি করে, ফলে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে। অতীতের এল নিনো ঘটনাগুলো খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শত শত বিলিয়ন ডলার থেকে ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে।
এল নিনো সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছায়। তাই বছরের আরও কয়েক মাস বাকি থাকায় এটি সত্যিই আগের সব রেকর্ড ভাঙবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে এল নিনো ‘সুপার’ পর্যায়ে না পৌঁছালেও এর প্রভাব যে অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে, এমনটাই আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের।
যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলে আর্থ-এর জলবায়ু বিজ্ঞানী জিক হসফাদার বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে ২০২৭ সাল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৯৮ সালে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি এল নিনো এবং সেই সময়কার হিসেবে অত্যন্ত উষ্ণ একটি বছর দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক একই ঘটনা যদি আজ ঘটত, তাহলে গত ২০ বছরের তুলনায় সেটিকে বরং তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা বছর বলা যেত।’
ধেয়ে আসছে ‘এল নিনো’, ভাঙতে পারে অতীতের সব রেকর্ড
কী এই লা নিনা ও এল নিনো?