ভাটার টানে শাকবাড়িয়া নদীর পানি অনেকটা নেমে গেছে। নদীর বুকজুড়ে তখন কাদামাটির বিস্তৃত চর। একদিকে সুরঞ্জন রপ্তানের বাড়ি, অন্যদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জোয়ার-ভাটার ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। মাঝখানে শুধু নদী আর কাদামাটির পথ।
এই বনই সুরঞ্জনের কাছে শুধু বন নয়—একটি জীবন্ত ওষুধের দোকান।
চল্লিশ বছর বয়সী সুরঞ্জন রপ্তান স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন কবিরাজ। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি সুন্দরবনের গাছপালা, লতা-পাতা, শিকড় ও ছাল থেকে ভেষজ উপাদান সংগ্রহ করে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করেছেন। সূর্য ওঠার আগেই ছোট নৌকা নিয়ে বনে ঢোকেন তিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খালি পায়ে কাদার মধ্যে হাঁটেন। সঙ্গে থাকে গাছের অংশ সংগ্রহ করার জন্য একটি ছুরি।

সেদিনও তাঁর গন্তব্য সুন্দরবন। তবে নিজের নৌকা নেই। তাই চাচার নৌকা ধার করতে বাড়ির সামনে গিয়ে ডাক দিলেন—
‘চাচা, বাড়িতে আছেন?’
ভেতর থেকে জবাব এল। চাচা চাপল রপ্তান—মধু সংগ্রহকারী। মাঝারি গড়নের এই মানুষটির মুখে পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট।
‘সুরঞ্জন? ভেতরে এসে বসো।’
কিন্তু চাপলের গলা ভাঙা। আগের দিন বৃষ্টিতে কাজ করার পর ঠান্ডা লেগেছে, তাই বিশ্রাম নিচ্ছেন।
সুরঞ্জনও বসে সময় নষ্ট করলেন না। চাচাকে পরামর্শ দিলেন তুলসীপাতা ও মধু দিয়ে গরম চা খেতে। তাঁর বিশ্বাস, এতে ঠান্ডার উপসর্গ কিছুটা কমতে পারে।
এরপর চাচার কাছ থেকে নৌকাটি কোথায় রাখা আছে জেনে নিয়ে রওনা হলেন বনের উদ্দেশে।
বাড়ির উঠান পেরিয়ে রাস্তা, তারপর শাকবাড়িয়া নদী। নদীর ওপারেই সুন্দরবন। উল্টে রাখা নৌকাটি সুরঞ্জন পানিতে নামালেন। নদীর কাদায় বন থেকে ভেসে আসা পাতা ও ফল জমে আছে। আঠালো কাদায় তাঁর পা বেশ গভীরভাবে ডুবে গেল।

নৌকায় উঠে পা দুটো পানিতে ঝুলিয়ে কাদা ধুয়ে নিলেন। তারপর বাতাসের সঙ্গে ছোট ছোট ঢেউ পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন সুন্দরবনের দিকে।
বনে পা রাখতেই বদলে গেল চারপাশের পরিবেশ। ভেজা মাটি ও লবণাক্ত পানির গন্ধে বাতাস ভারী। পানির ভেতর থেকে ম্যানগ্রোভের শিকড়গুলো আঁকড়ে ধরা নখরের মতো উঠে এসেছে। আধো আলোয় মাছরাঙার তীক্ষ্ণ ডাক, পোকামাকড়ের গুঞ্জন আর বাতাসে পাতার মৃদু দোল—সব মিলিয়ে অন্য এক জগৎ।
সুরঞ্জন খালি পায়েই হাঁটেন। তাঁর কাছে এর আলাদা কারণ আছে। খালি পায়ে মাটির অবস্থা বোঝা যায়, নিঃশব্দে চলাফেরা করা যায়। অন্যদিকে স্যান্ডেল কাদায় সহজেই পিছলে যেতে পারে।
হঠাৎ কাদার ওপর ছোট একটি গর্ত দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘এখান দিয়ে কিছুক্ষণ আগে হরিণ গেছে।’
তারপর একটি ঝোপের সামনে থামলেন।
‘এই পাতাগুলো পেটব্যথা হলে পানিতে ফুটিয়ে খেতে হয়।’
কিছুদূর এগিয়ে একটি উঁচু গাছের ছালে হাত রাখলেন।
‘এই ছাল একটু ঘষে পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে অনেক দিনের কাশি কমাতে সাহায্য করে।’
সুন্দরবনের গাছপালা তাঁর কাছে যেন একটি খোলা ভেষজ অভিধান। কোন গাছের কোন অংশ কী কাজে লাগে, কোন ঋতুতে কোন উদ্ভিদ পাওয়া যায়—এসব তাঁর শেখা জ্ঞান।
একসময় সামনে এলো সুন্দরী গাছ। গাঢ় সবুজ ডিম্বাকৃতির পাতার এই গাছটিই সুন্দরবনের নামের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত।
সুরঞ্জন বললেন, ‘এই গাছের নাম থেকেই সুন্দরবনের নাম হয়েছে। এখন এটি আগের মতো সহজে দেখা যায় না। এখানে এমন একটি গাছ দেখতে পাওয়াই সৌভাগ্যের।’
কথা বলতে বলতে তাঁর মনে পড়ে যায় অন্য এক সুন্দরবনের কথা।
‘ঘূর্ণিঝড় আইলার আগে, ২০০৯ সালে, বন এত ঘন ছিল যে সূর্যের আলোও ভেতরে ঢুকতে পারত না,’ তিনি স্মৃতিচারণ করেন। ‘তারপর থেকে বন পাতলা হতে শুরু করেছে। এখন অনেক জায়গাই ফাঁকা মনে হয়।’
২০১৫ কিংবা ২০১৬ সালের দিকে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে জানান তিনি। আগে যেসব জায়গা ঘন ছায়ায় ঢাকা থাকত, সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাতে শুরু করে। একই সঙ্গে তাঁর পরিচিত অনেক ভেষজ উদ্ভিদও খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সেদিনও তিনি বিশেষ একটি গাছের সন্ধানে ছিলেন। আগেরবার বনে এসে অনেক খুঁজেও গাছটি পাননি। এবারও না পেলে তাঁর আশঙ্কা আরও বাড়বে—গাছটি হয়তো এই বন থেকে হারিয়েই যাচ্ছে।
সুরঞ্জনের কবিরাজি শেখার গল্পও এই বনের মতোই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে এসেছে। প্রায় ২১ বছর ধরে তিনি এই পেশায় আছেন। তাঁর বাবা তাঁকে শিখিয়েছেন; বাবাকে শিখিয়েছিলেন তাঁর দাদা।
এই জ্ঞান কোনো বইয়ে লেখা ছিল না। ছিল মানুষের স্মৃতিতে, হাতে-কলমে শেখার অভিজ্ঞতায়। কোন গাছ চিনতে হবে, কোথায় সেটি পাওয়া যায়, গাছের কোন অংশ সংগ্রহ করতে হয় এবং কীভাবে তা ওষুধ হিসেবে প্রস্তুত করতে হয়—সবই তিনি শিখেছেন দীর্ঘ অনুশীলন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
কিন্তু এখন সেই জ্ঞানকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে বন প্রয়োজন, সেই বনই বদলে যাচ্ছে।

গাছ কমছে, পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে, আর সুরঞ্জনের মতো মানুষদের কাছে সুন্দরবনের পুরোনো চেহারা ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।
সুন্দরবন তাই শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ কিংবা মধুর বন নয়। এই বন বহু মানুষের কাছে খাদ্য, জীবিকা ও চিকিৎসারও আশ্রয়। বনের কোনো একটি গাছ হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রজাতির ক্ষতি নয়—তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে শত বছরের লোকজ চিকিৎসাজ্ঞানও।
সুরঞ্জন যখন কাদার ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটেন, তখন তাঁর পায়ের ছাপ শুধু একজন কবিরাজের পথচলার চিহ্ন নয়। সেই ছাপ যেন সুন্দরবনের হারিয়ে যেতে বসা এক অদৃশ্য ভেষজ ভাণ্ডারেরও সাক্ষ্য বহন করে।
সূত্র: আল জাজিরা